Loading...

জার্মানির এরলাঙ্গেনে জমজমাট দুর্গাপুজোর আয়োজন, দুর্গাভিলের পুজোতেও চমক, এবছরের বিশেষ আকর্ষণ কী?

আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রবাসে দুর্গাপুজো মানে শুধু কয়েকটা দিনের উৎসব নয়। বাড়ি থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে একটু একটু করে নিজের ফেলে আসা বাংলাকে আবার তৈরি করার চেষ্টা। পরিচিত ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ, অঞ্জলির ফুল, পুজোর ভোগ, আড্ডা—আর সেই অদ্ভুত অনুভূতি, যখন বিদেশের কোনও শহরের একটি কোণে হঠাৎ মনে হয়, এ তো আমাদেরই পাড়া!

সেই অনুভূতি থেকেই ২০২১ সালে জার্মানির বাভারিয়ার এরলাঙ্গেনে মাত্র তিনটি বাঙালি পরিবারের হাত ধরে শুরু হয় দুর্গাভিলের এরলাঙ্গেন শারদ উৎসব।

ADVERTISEMENT

শুরুটা ছোট ছিল, স্বপ্নটা ছিল অনেক বড়। উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটি হলে প্রতিমা এনে কয়েকদিন পুজো করে ফিরে যাওয়া নয়; যতটা সম্ভব বাংলার দুর্গাপুজোকে তার প্রস্তুতি, আচার, শিল্প, খাবার, সংস্কৃতি আর আবেগ—সবকিছুনিয়ে প্রবাসের মাটিতে বাঁচিয়ে রাখা।

আরও পড়ুন

তারপর বছর গড়িয়েছে। তিনটি পরিবারের সেই ছোট্ট উদ্যোগকে ঘিরে আজ তৈরি হয়েছে অনেক বড় একটি পরিবার। কর্মসূত্রে জার্মানিতে আসা বাঙালি পরিবারগুলির পাশাপাশি এরলাঙ্গেন ও আশপাশের শহরে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীরাও এই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণঅংশ। বাড়ি থেকে দূরে থাকা বহু ছাত্রছাত্রীর কাছে পুজোর এই কয়েকটা দিন তাই শুধু উৎসব নয়—একটু বাড়ি ফিরে পাওয়ার মতো।

মায়ের জন্মও এরলাঙ্গেনেই

এই পুজোর একটা বিশেষ গল্প আছে। প্রতিমা তৈরি হয় এরলাঙ্গেনে। মাটি থেকে ধীরে ধীরে কাঠামো, অবয়ব, রং, সাজ—মাসের পর মাস ধরে নিজেদের হাতে মাকে গড়ে উঠতে দেখতে দেখতে পুজো আর শুধু ষষ্ঠী থেকে দশমীর কয়েকটা দিনে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় উৎসবের প্রস্তুতি।

খুঁটিপুজো, কাঠামোপুজো থেকে চক্ষুদান—বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছোট-বড় যতটা ঐতিহ্য সম্ভব, প্রবাসের মাটিতেও তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয় এখানে।

শুধু প্রতিমাই নয়, মণ্ডপও প্রতি বছর বদলে যায়। প্রতি বছর নতুন ভাবনা, নতুন নকশা, নতুন নির্মাণ। কোনও পেশাদার মণ্ডপশিল্পীর দল নয়—দুর্গাভিলের সদস্যরাই নিজেদের হাতে তৈরি করেন সেই বছরের মণ্ডপ। কখনও সেখানে বাংলার লোকশিল্পের ছোঁয়া, কখনও বনেদিবাড়ির আবহ, কখনও আবার সম্পূর্ণ অন্য কোনও ভাবনা। ফলে প্রতি বছর মায়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রূপে জন্ম নেয় তাঁর ঘরটিও।

আর পুজোর আচারেও রয়েছে বাংলার সঙ্গে এক সরাসরি যোগ। প্রতি বছর এখানে পুরোহিত আসেন নদিয়ার রানাঘাট থেকে। হাজার হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে তাঁর এরলাঙ্গেনে আসা যেন পুজোর আগমনী প্রস্তুতিরই একটা অংশ হয়ে গিয়েছে।

প্রবাসের বাস্তবতার মধ্যে থেকেও পুজোর আচার, মন্ত্র এবং রীতিনীতিকে যথাসম্ভব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা থাকে প্রথম দিন থেকেই।

পুজো সকলের

বছরের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে, আয়োজনও বড় হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় বদলায়নি—দুর্গাভিলে পুজো সকলের জন্য।

এখানে মায়ের দর্শনের জন্য কোনও প্রবেশমূল্য নেই। অঞ্জলি দিতে কিংবা বসে পুজোর ভোগ খেতেও কাউকে কোনও মূল্য দিতে হয় না। কে সদস্য, কে অতিথি, কে ছাত্র, কে এই শহরে নতুন—পুজোর ওই কয়েকটা দিনে সেই বিভাজনটুকুও যেন মিলিয়ে যায়।

কারণ উদ্যোক্তাদের কাছে ভোগ শুধু খাবার নয়। পাশাপাশি বসে খাওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হওয়া, কেউ রান্নাঘরে হাত লাগানো, কেউ খাবার পরিবেশন করা—এসবের মধ্যেই তৈরি হয় প্রবাসের পুজোর সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলি।

ফিরে দেখা ২০২৫

২০২৫ সালে ছিল দুর্গাভিলের পঞ্চম এরলাঙ্গেন শারদ উৎসব। সেবারের পুজোর আসর বসেছিল এরলাঙ্গেনের কাছেই বুবেনরয়থে।

সেই বছরটি ছিল বিশেষ আবেগেরও ছিল। এরলাঙ্গেনে নিজেদের হাতে তৈরি যে প্রতিমাকে ঘিরে তিন বছর ধরে পুজোর অসংখ্য স্মৃতি জমেছিল, সেই রূপে মাকে দেখার সেটিই ছিল শেষ বছর।

পুজোর দিনগুলিতে বোধন থেকে অঞ্জলি, সন্ধিপুজো থেকে দশমী—আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছিল গান, নাচ, আবৃত্তি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর অবশ্যই ছিল সকলের জন্য পুজোর ভোগ। মণ্ডপসজ্জায় ছিল বাংলার পটচিত্রের অনুপ্রেরণা।

কিন্তু মঞ্চে বা মণ্ডপে যা দেখা যায়, তার বাইরেও থাকে আর একটি পুজো। কেউ মাসের পর মাস প্রতিমা তৈরি করছেন, কেউ মণ্ডপের কাজে, কেউ রান্নাঘরে, কেউ পুজোর আয়োজনে, কেউ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, কেউ অতিথিদের দেখাশোনায়, আবার দিনের শেষে কেউ চেয়ার-টেবিল গুছিয়ে রাখছেন।

এই মানুষগুলিই আসলে দুর্গাভিল।

২০২৬ — আলোয় লেখা নতুন অধ্যায়

এ বছর ষষ্ঠ এরলাঙ্গেন শারদ উৎসব।

১৬ থেকে ২১ অক্টোবর ২০২৬, আবার এরলাঙ্গেনে মায়ের আগমন। আর এবারের পুজো ছ’বছরের যাত্রায় একেবারেই নতুন একটি অধ্যায়।

নতুন প্রতিমা তৈরি হয়েছে এখানেই, সদস্যদের হাতে। আর তাঁর জন্য তৈরি হচ্ছে এমন এক মণ্ডপ, যা আগের কোনও বছরের পুনরাবৃত্তি নয়।

এবারের মণ্ডপের অন্যতম আকর্ষণ আলো।

শুধু মণ্ডপকে আলোকিত করা নয়—আলোই এবার মণ্ডপসজ্জার একটি জীবন্ত অংশ। আলোর বদল, তার ছন্দ, উজ্জ্বলতা ও আবহের মাধ্যমে একই মণ্ডপ মুহূর্তে মুহূর্তে যেন নতুন রূপ নেবে। এই আলোকসজ্জার পরিকল্পনা থেকে নির্মাণ, বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা থেকে আলোর ছন্দের নির্দেশনা—সবকিছুই হাতে তৈরি এবং নিজেদের সদস্যদের দ্বারাই পরিকল্পিত ও প্রোগ্রাম করা।

প্রযুক্তির শহর এরলাঙ্গেনে দাঁড়িয়ে বাংলার দুর্গাপুজোর শিল্প আর আধুনিক প্রযুক্তির এই মিলন এবারের পুজোর নিজস্ব ভাষা।

তবে প্রযুক্তি নয়, পুজোর প্রাণ থাকবে সেই চিরপরিচিত জায়গাতেই—মায়ের সামনে।

এবারও প্রতিটি দিন সকলের জন্য উন্মুক্ত। দর্শন, পুজো কিংবা ভোগের জন্য কোনও প্রবেশমূল্য বা আগাম নাম নথিভুক্ত করার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন দু’বেলা থাকবে সকলের জন্য পুজোর ভোগ। সঙ্গে থাকবে গান, নাচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা এবং ছোট-বড়সকলকে নিয়ে পুজোর চেনা আনন্দ।

ছ’বছর আগে তিনটি পরিবার যে পুজোর প্রদীপ জ্বালিয়েছিল, সেই আলো আজ বহু পরিবার, ছাত্রছাত্রী, স্বেচ্ছাসেবী এবং শুভানুধ্যায়ীকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে।

এবার শহরের পথে মা

আর ২০২৬-এর গল্প এবার মণ্ডপেই শেষ হবে না।

পুজোর কয়েকদিন পরে, ২৪ অক্টোবর, প্রথমবারের মতো এরলাঙ্গেন শহরের কেন্দ্র দিয়ে আয়োজন করা হয়েছে মায়ের বিসর্জনের শোভাযাত্রা।

ঢাক, বাজনা, গান আর নাচের সঙ্গে শহরের পথ ধরে এগিয়ে যাবে প্রতিমা। যে শহরে পুজো বড় হয়ে উঠেছে, এবার সেই শহরের মানুষের সঙ্গেই পুজোর শেষ অধ্যায়টুকুও ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা।

শোভাযাত্রা শেষে একটি অস্থায়ী জলাধারে হবে প্রতীকী বিসর্জন। পরিবেশের কথা মাথায় রেখে বিসর্জনের পরে প্রতিমার মাটি জল থেকে সংগ্রহ করা হবে এবং জলও স্থানীয় নিয়ম মেনে নিষ্কাশন করা হবে।

এই আয়োজনের মধ্যে একটা প্রতীকী অর্থও আছে। দুর্গাপুজোকে শুধু নিজেদের চার দেওয়ালের মধ্যে ধরে রাখতে চান না উদ্যোক্তারা। তাঁদের ইচ্ছে, জার্মান বন্ধু, প্রতিবেশী এবং অন্য সংস্কৃতির মানুষেরাও দেখুন—কীভাবে একটি উৎসব মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে আসে।

প্রবাসে দুর্গাপুজো শুধু বাংলাকে মনে করার উৎসব নয়।

এখানে বড় হয়ে ওঠা বাঙালি সন্তানদের কাছে বাংলা, তার সংস্কৃতি এবং তার উৎসবকে জীবন্ত করে তোলার একটা উপায়। বাড়ি থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের কাছে কয়েকটা দিনের জন্য পরিচিত একটা আশ্রয়। আর জার্মান বন্ধু ও প্রতিবেশীদের কাছে নিজেদের সংস্কৃতির দরজাটা খুলে দেওয়ার একটা সুযোগ।

প্রতি বছর তাই মায়ের মুখে রং পড়তে শুরু করলে, নতুন মণ্ডপের কাঠামো একটু একটু করে দাঁড়ালে, রান্নার পরিকল্পনা শুরু হলে কিংবা দূর থেকে প্রথম ঢাকের আওয়াজটা কানে এলে—এরলাঙ্গেন আর তখন শুধু জার্মানির একটা শহর থাকে না।

কয়েকটা দিনের জন্য, এই শহরেরই এক কোণে ছোট্ট একটা বাংলা তৈরি হয়ে যায়।

আর তারপর দশমী আসে। আবার অপেক্ষা শুরু হয়।

আসছে বছর আবার হবে।

ADVERTISEMENT