আর ক’দিন পরেই শুরু হয়ে যাবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব-দুর্গাপুজো। এহেন উৎসবের আমেজে বুঁদ হয়ে অতীতের পাতা উল্টোলেন অভিনেতা রজতাভ দত্ত। এই জনপ্রিয় শিল্পী যেমন শোনালেন দারুণ সব রংদার পুজোর অভিজ্ঞতা তেমনই জানালেন দুর্গাপুজো এখন যেমন ভাললাগার তেমন খানিক ব্যস্ততারও। যদিও তার মধ্যে অবশ্যই আলতো করে লেগে থাকে আড্ডার পরত। এবং এই শারদ আবহে অবশ্যই বাছাই করে গল্প-উপন্যাস-গ্রাফিক নভেলে স্রেফ ডুবে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ মওকা। দক্ষিণ কলকাতার প্রতাপাদিত্য রোডে কেটেছে যাঁর শৈশব ও কৈশোর, সেই ‘রনিদা’ শুনিয়ে গেলেন তাঁর ছোটবেলার কলকাতার শারদ আড্ডা, গ্যাস বেলুনের রোমাঞ্চ এবং প্রেম ছাড়া কেটে যাওয়া এক অদ্ভুত বাউন্ডুলে পুজোর দিনগুলোর গল্প।
“আমার ছোটবেলা কেটেছে দক্ষিণ কলকাতার মুদিয়ালি অঞ্চলের প্রতাপাদিত্য রোডে। শুধু ছোটবেলাই বা বলি কেমন করে, আমার বড় হওয়াটা দেখেছে সার্দান অ্যাভিনিউয়ের ওই অঞ্চল। ক্লাস সেভেন-এইট পর্যন্ত আত্মীয়দের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেড়াতাম, কারণ বাবা এমন একটা চাকরি করতেন যে পুজোর সময় খুব একটা ছুটি পেতেন না আর বাড়িতে যে আত্মীয়রা আসতেন, তাঁদের জন্য রান্নাবান্না করতে এতটা ব্যস্ত থাকতেন যে তিনিও আলাদা করে সময় দিতে পারতেন না। তাই পুজোয় বাড়িতে ঘুরতে আসা আত্মীয়দের সঙ্গেই প্যান্ডেল দেখতে বেরিয়ে পড়তাম। তবে সেই বয়সে খুব যে দূরে-দূরে যেতাম, এমনটা কিন্তু নয়। ওই আশেপাশের আর খানিক দূরের। ওই বয়সে আর পাঁচজনের মতোই পাড়ার মানে প্রতাপাদিত্য রোডের পুজোর প্যান্ডেলের বাঁশ ধরে ঝোলাঝুলি, মঞ্চ বাঁধা হচ্ছে দেখে একটু তার উপর থেকে লাফালাফি, তারপর এন্তার চোট পাওয়া... আর ওই বয়সে আর একটা জিনিস পাওয়ার জন্য খুব রোমাঞ্চ বোধ করতাম - গ্যাস বেলুন। হ্যাঁ, প্রতিদিন নতুন রঙের একটা করে গ্যাস বেলুন কিনে দেওয়া হত আমাকে। আর ওই গ্যাস বেলুন বানানোর যন্ত্র নিয়ে তো বেলুনওয়ালারা ঘুরতেন। যন্ত্রটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল - অনেকটা উল্টানো গামলার মতো দেখতে। আর যেভাবে বেলুনের মধ্যে গ্যাস পোরা হত, দেখে দারুণ মজা লাগত! তখন দাম ছিল পাঁচ পয়সা পার পিস্। তারপর যা হওয়ার তাই হত। হাত থেকে খানিকক্ষণ পরেই ‘উড়ে’ পালাতো গ্যাস বেলুন। তবে আমার একার নয় কিন্তু। তখন পুজোর সময় কলকাতার আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে গ্যাস বেলুন দেখা যেত!
তখন পঞ্চমীর ভোররাতে প্যান্ডেলে দূর্গা প্রতিমা আসতো। আধো ঘুমের মধ্যে “ ‘বলো দুগ্গা মাঈকি জয়’ শুনতে পেতাম আর বুঝে যেতাম এবার শুরু হল পুজো। পরদিন ভোর থেকেই পাড়ায় এইচএমভি নতুন-নতুন গানের রেকর্ড বাজতে শুরু করে দিত। বুঝে যেতাম আগামী চারদিন পাড়ায় সবার নিত্যদিনের সঙ্গী হতে চলেছে এই গানগুলোই। খুব মনে আছে, এক বছর চরম শুনলাম ‘রাম্বা হো’, পরের বছর আবার ‘ম্যান মেশিন’। বাংলা গানের পাশাপাশি এই গানগুলোও কিন্তু পাড়ার দৌলতে পুজোতে চুটিয়ে শুনেছি। আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া সারতাম বাড়িতেই। বড়জোর পাড়ায় ভোগ খেলাম...এইটুকুই। বাইরে খুব একটা খাওয়া হতো না। আমাদের সেই সময়ে থিমের পুজোর চল ছিল না। তখন থিমের পুজো বলতে বুঝতাম হাজরার আশেপাশে সঙ্ঘশ্রী এবং সংঘমিত্র বলে দুটক্লাবের প্যান্ডেল ছিল। মণ্ডপের মধ্যে মেঘের আলাদা একটা প্যানেল তৈরি হত, একটা ইলেক্ট্রিক্যাল তারের মধ্যে জড়িয়ে আলোর তীর আস্তে আস্তে গিয়ে অসুরের বুকে গিয়ে বিঁধত আর কতরকমের আলো জ্বলে উঠত। ওই তিন-চার মিনিটের এক-একেকটা শো দেখার জন্য কী যে ভিড় হত, এখন ভাবলে অবিশ্বাস্য লাগে!
এরপর খানিক বড় হওয়ার পর আমার বন্ধুবান্ধবের একটা বড় দল হল দেশপ্রিয় পার্ক, ত্রিধারা ক্লাবের ওদিকে। তখন ক্লাস নাইন। টানা দশ-বারো বছর ধরে ওখানেই প্রতি বছর ধরে পুজো কাটিয়েছি। ফলে সেই সময়ের পুরোটাই ত্রিধারা ক্লাবে আড্ডা, হইচই করেই কেটেছে, দেশপ্রিয় পার্কে আড্ডাও চলেছে দেদার। ওদের সঙ্গেই কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আনতে যাওয়া, ভাসানে যাওয়া, ভাসানে শাড়ি পরা কলা বউ সেজে নাচ...যাবতীয় বাঁদরামো, হুজ্জতি সবই করেছি ত্রিধারা ক্লাবে। এই এতরকম বাউন্ডুলে পান ছিল যে প্রেমের বিষয়টা মাথাচাড়া দেয়নি তখনও আমার। প্রাক-যৌবনকে উদযাপন করার এত দিক ছিল যে সেই সময়ের পুজোয় প্রেম-টেম আমার হয়নি।
খানিক থামলেন রজতাভ। তারপর যখন বলা শুরু করলেন, তাঁর কথায় উঠে এল পুজোর খাওয়াদাওয়া– “যদিও আমি খুব ‘ফুডি’ তবু পুজোর সময় আমি খুব একটা বাইরে খাই না। তখনও খেতাম না। কারণ সেই সময়ে ডিমান্ডের তুলনায় সাপ্লাই এতটা কমে যায় যে খাবারের ম্যান খানিক কম্প্রোমাইজ করতে হয়ত বাধ্য হন অনেকেই। তাই সেই সময় বন্ধুদের সঙ্গে পাড়ায়-বেপারে ভোগ খাওয়ার পাশাপাশি বন্ধুদের বাড়িতেও পুজোর নিমন্ত্রণ রক্ষা করেছি হইচই করেই। আর পুজোর পোশাক নিয়ে কোনওদিনই আমার খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না তখনও, আজও নেই। আমার মনে হয়, পুজোর সময়ে সকলে নিজেকে নিয়ে এতটা ব্যস্ত থাকে যে অন্যদের দিকে খুঁটিয়ে দেখার সময় থাকে না। তাই একটা সুন্দর, চলনসই পোশাক থাকলেই চলবে। কারণ, আমার মনে হতো এই পোশাকে যে আমাকে প্রথমবার দেখছে, তার কাছে তা তো নতুনের মতোই লাগবে। তাই না?”
বহু বছর ধরেই রজতাভ দত্তের কাছে পুজো কিন্তু বদলে গিয়েছে। জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে রাস্তাঘাটে হাঁটলে যা হয়, সেসব বিষয়ের মুখোমুখি হন তিনিও। এখন তাহলে পুজো কীভাবে কাটে তাঁর? রজতাভ দত্তের কথায়, “প্যান্ডেলে আর ঘোরা হয় না। তবে একাধিক সংস্থার তরফে পুজোর বিচারক হওয়ার সুবাদে ভিড় ঠেলে ঢোকা ছাড়াই বিভিন্ন মণ্ডপ দেখা হয়ে যায় আমার। এছাড়া, পুজোয় আমি খুব ছবি দেখি। আমার স্ত্রী অত ছবির পোকা নয়, তাই একেক সময় নিজেই টিকিট কেটে একা বসে প্রেক্ষাগৃহে ছবি উপভোগ করি। এছাড়া সল্টলেকের যে পাড়ায় থাকি, পুজোয় একদিন সেখানকার কমিউনিটি হলে খাওয়াদাওয়া করি সবার সঙ্গে। আর সন্ধ্যায় নিজের বাড়ি অথবা বন্ধুদের বাড়ি আড্ডা তো আছেই। তবে আরেকটি জিনিসও পুজোতে খুব উপভোগ করি আমি, তা হল নতুন গল্পের বই এবং কমিকস। আরও ভাল করে বললে, পুজোর নরম রোদের দুপুরে একা-একা গ্রাফিক নভেলের দু’মলাটের ডুবে যাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ, তা আমার কাছে অমূল্য।”