Loading...

পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, পাট-ভাঙা নতুন শাড়ি আর দেদার আড্ডা, ক্যালিফোর্নিয়া এবার পুজোয় কলকাতাকে খুঁজবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে

মনিদিপা দাশ ভট্টাচার্য: আমেরিকাতে এই অক্টোবর মাস হল ফল সিজন বা পাতা ঝরার মরশুম। ঠিক এই সময়ই আমার কলকাতা শহর, তার অলিগলিতে শেষ মুহূর্তের চূড়ান্ত ব্যস্ততা। নিউ মার্কেট থেকে গড়িয়াহাট, হাতিবাগান থেকে দক্ষিণাপণ সব জায়গাতেই প্রতি বছরের এক চেনা আবহ। নতুন জামা, নতুন শাড়ির গন্ধ, শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নানা ধরণের গয়না-গাটি, জুতোর দোকানের বাইরে লম্বা লাইন ঠেলে পছন্দসই জুতো কেনা। সবটাই হয় একটাই উপলক্ষকে ঘিরে। দুর্গা তার বাপের বাড়ি আসছে যে।

আচ্ছা, দুর্গার বাপের বাড়িটা ঠিক কোথায় কেউ বলতে পারবে? দেশ ছেড়ে প্রবাসে আসার পর একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝেছি, দূরত্ব আসলে শুধু ভৌগোলিক হয় না। কিছু কিছু দূরত্ব মনের মধ্যেও তৈরি হয়। আবার আমাদের জীবনে এমন কিছু বিষয় থাকে, যা বোধহয় যেকোনও দূরত্বকেই এক মুহূর্তে মুছে দিতে পারে। শারদীয়া দুর্গাপুজো আপামর বাঙালির জীবনে ঠিক তেমনই একটি অনুভূতি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালির অবস্থান, সেখানকার আকাশ-বাতাসও যেন ঠিক জেনে যায় আগমনী বার্তা। তাই বোধহয় এই বিশ্ব ব্রম্ভাণ্ডের যেখানেই বাঙালি থাকবে, সেখানেই এই শরতের মরশুমে হয়ে ওঠে দুর্গার বাপের বাড়ি।

ADVERTISEMENT

ক্যালিফোর্নিয়ার বাতাসে হয়তো আমরা শিউলি ফুলের গন্ধ পাইনা। কিন্তু আশ্চর্যরকম ভাবে, বে এরিয়ায় শরতের আকাশ একটু একটু করে বদলাতে শুরু করে দিয়েছে। নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মত ভেসে বেড়ানো মেঘেরাও হয়ত জেনে গেছে এটাই বাঙালিদের সবচেয়ে প্রিয় মাস, উৎসবের মাস। আর এই দূর প্রবাসে থেকে সব বাঙালি মনই অনুভব করে, আসলে আমরা শুধু একটা দেশ ছেড়ে আসিনি। আমরা ছেড়ে এসেছি একটা জীবনযাপন। কলকাতা আসলে শুধু একটা শহর নয়। কলকাতা আমাদের বাঙালিদের অভ্যাস, আমাদের ছেড়ে আসা অজস্র স্মৃতি, আমাদের চেনা গলির গন্ধ, আমাদের উৎসবের আনন্দ। আমাদের একান্ত জীবনযাপন। আর সেই জীবনযাপনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি বোধহয় দুর্গাপুজো।

আরও পড়ুন

আজ থেকে দশ বছর আগে, ক্যালিফোর্নিয়ার বে-এরিয়ার একদল বাঙালির হাত ধরে এসেছিলো আগমনী। শুরুর সময় থেকেই এই পুজোর সঙ্গে আমার মতো এখানকার বহু অনেক প্রবাসী বাঙালির মধ্যে একটা আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। দেখতে দেখতে এ বছর আগমনী পা দিচ্ছে তার দশম বর্ষে।

দশ বছর! ভাবতে গেলে অবাক লাগে। এই দশ বছরে কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ আবার অন্য শহরে চলে গেছে, কত নতুন মুখ আমাদের পরিচিত হয়েছে, কত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পুজোর এই ক'টাদিন যত কাছে আসতে থাকে, ততই সবাই যেন আবার একই জায়গায় এসে দাঁড়াই। সারা বছরের ব্যস্ততা, অফিস, সংসার সামলে, প্রবাস জীবনটা সব পেয়েছির মধ্যেও, আসলে বড্ড শূন্যতায় ভরা। আগমনীর এই দুর্গাপুজো ঘিরে, বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই, সবার মধ্যে তৈরি হয় এক বিপুল উত্তেজনা।

এবারের দশম বর্ষ তাই ভাবনা থেকে বিস্তার সবটাই একটু অন্যরকম। এই বছর আগমনীর প্যান্ডেলে থাকছে বিশেষ চমক। কলকাতার ‘ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের’ একটি আদল পূজা মণ্ডপ রূপে উঠে আসবে এই বে-এরিয়াতে। কুমোরটুলির বিশিষ্ট শিল্পী, কৌশিক ঘোষের হাতে তৈরি সেই প্যান্ডেলের সাজসজ্জা কলকাতা থেকে পাড়ি দিয়ে এসেছে এই দূর প্রবাসে। ভাবলেই কেমন এক ভাললাগা তৈরি হচ্ছে। কলকাতার মাটিতে তৈরি একটি শিল্পকর্ম এত দূর প্রবাসে এসে, আগমনীর পুজোর এইবারের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠতে চলেছে। তবে এখানে আরও সুন্দর একটা বিষয় হল, কলকাতা থেকে আসা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাজসজ্জা দিয়ে, এই মন্ডপটির সম্পূর্ণ কাঠামো এবং তার সঙ্গের নানা খুঁটিনাটি থেকে আস্ত একটা মাতৃ মন্ডপকে অত্যন্ত যত্ন সহকারে নিজেদের হাতে শেষ করছেন আগমনীর সদস্যরা। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে, মনে হয় শুধু প্যান্ডেল তৈরি নয়, বরং এই সাজ সজ্জার আড়ালে কোথাও আসলে তারা নিজেদের হাতে আরেকবার প্রবাসের মাটিতে কলকাতাকে ছুঁয়ে দেখতে এবং সবাইকে দেখাতে চায়।

এই বছর আগমনীর দুর্গাপূজার মণ্ডপে যেমন চমক থাকছে, তেমনই আরেক বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে, চন্দননগর থেকে আসা আলোকসজ্জা। সেই আলো যখন বে এরিয়ার এই পুজোর রাতকে আলোকিত করবে, তখন হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হবে, আমরা আর ক্যালিফর্নিয়ায় নেই। অথবা এখানেই যেন এক টুকরো চেনা বাংলাকে ফিরে পাবে আগমনীর পুজোর মধ্যে দিয়ে। ‘আগমনী’তার নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে, দুর্গার আগমন বার্তা। এই পুজোর সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় যদি বলতে বলা হয়, তাহলে সবাই একবাক্যে বলবে, আগমনীর পুজোর সামগ্রিক পরিবেশ। স্যান রামন শহরের এক প্রান্তে, খোলা আকাশের নীচে বিস্তৃত জায়গা জুড়ে পুজোর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। যেন মনে হয় এখানেই এক টুকরো ম্যাডক্স স্কোয়ার তৈরি হয়েছে। চারপাশে বাংলা কথা, পাট ভাঙা নতুন শাড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে জোরদার আড্ডা, দেশ থেকে আসা বাবা-মায়েদেরকে নতুন এক পুজোর অনুভূতির অংশীদার করে তোলা থেকে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে, বাঙালীয়ানার রূপ,রসকে পৌঁছে দেওয়ার নিরলস প্রচেষ্টার নামই বোধহয় বে এরিয়া আগমনীর দুর্গাপুজো।

আসলে দুর্গাপুজো মানে যেমন চন্ডী পাঠ থেকে মায়ের বোধন, আরতি ধুপ-ধুনোর গন্ধ। তেমনই সেই ধূপের ধোঁয়ায় মিলে, মিশে একাত্ম হয় বাঙালির চিরপরিচিত আবেগ থেকে ভোগের খিচুড়ি, লাববা, পায়েসের স্বাদ।

নিজের দেশের থেকে যোজন মাইল দূরে থেকেও, আগমনীর এই পুজো ঘিরে গত দশ বছরে, আমাদের প্রতিটি বাঙালিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক পারস্পরিক সহাবস্থান, বন্ধুত্ব। সারা বছরের ব্যস্ত জীবনের ছুঁটে চলার মাঝে, এই তিনদিনের পুজোর আমেজ দৈনন্দিন সব ক্লান্তিকে নিমেষে মুছে দেয়। বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই নাচ-গানে ভরপুর এক সাংস্কৃতিক বাতাবরণ। আগমনীর পুজোতে এর ব্যতিক্রম নেই। এই বছর আগমনীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও থাকছে বিশেষ আয়োজন। আগমনীর সদস্য এবং লোক্যাল আর্টিস্টদের বিভিন্ন অনুষ্ঠনের পাশাপাশি, এই বছর দেশ থেকে এই পুজো উপলক্ষ্যে আসছেন বাংলা ব্যান্ডের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী অনিন্দ্য বোস। আসছেন বহুমুখী প্রতিভার সংগীতশিল্পী ঋষি পাণ্ডা। আর এই আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য দুটি অনুষ্ঠানই বিনা টিকিটে সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। যে বিষয়টি কিন্তু শুনতে সহজ মনে হলেও, আদপে একেবারেই নয়। কারণ দেশ থেকে একজন শিল্পীকে অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসার নেপথ্যে থেকে যায় এক বহুল অর্থনৈতিক বিষয় থাকে। আগমনীর দুর্গাপুজোর আনন্দকে সবার মধ্যে একইভাবে অনুভব করানোর তাগিদ থেকেই অনুষ্ঠান গুলিকে মুক্ত মঞ্চে পরিবেশনার যে আয়োজন করা হয়েছে, তাতে নিঃসন্দেহে এই পুজোর আনন্দ দ্বিগুন হয়ে যাবে।

আগমনীর প্রেসিডেন্ট তানিয়া ভট্টাচার্য এই পুজো নিয়ে বলছেন, 'আমরা তো দেশ, শহর ছেড়েছি বহুকাল হয়ে গিয়েছে। আমাদের জীবনের সঙ্গে এই দুর্গাপুজো যেমন একাত্ম হয়ে আছে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা এই আমেরিকার মাটিতে জন্মেছে, বড় হচ্ছে, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের লোকাচার, শিল্প এই সবকিছু ওদের মধ্যেও যাতে একইভাবে অনুরণন হতে পারে, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। কারণ প্রবাসের এই পুজো শুধু আমাদের নিজেদের জন্য নয়। আমাদের হাত ধরে আমাদের পরের প্রজন্মও এই উত্তরণের পথে হাঁটুক বাঙালির স্বকীয়তা বজায় রেখে। ওরা অনেকেই হয়ত, জানে না কুমোরটুলি কী, চন্দননগরের আলো কী, কিংবা ম্যাডক্স স্কোয়ারে পুজোর ভিড় কেমন হয়। কিন্তু তারাই আগমনীর পুজোয় এসে দেখে, কত মানুষ একসঙ্গে বাংলা বলছে, বাংলা গান হচ্ছে, ঢাক বাজছে, ছোটরাও বড়দের সাথে সমান ভাবে মেতে উঠছে। নাচ-গান, নাটক সবকিছুর মধ্যে ওরাও ছুঁয়ে দেখছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের আবেগকে। যে আবেগকে ঘিরে রয়েছে, আমাদের কলকাতার গল্প, আমাদের শৈশবের গল্প, আমাদের শিকড়ের গল্প।'

সম্ভবত এটাই প্রবাসের বাঙালিদের কাছে দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। মাতৃআরাধনায় হয়ত দেবী দুর্গা শুধুমাত্র প্রতিমাতেই সীমাদ্ধ থাকে না। আগামীর প্রতিটি সদস্যের অক্লান্ত পরিশ্রমে রূপ পাওয়া মাতৃমন্ডপ থেকে আলোকসজ্জা, ভোগের খিচুড়ি থেকে মন্ত্রের পবিত্রতায়, সকলের সৃজনশীলতায় মিশে যায় দেবী দুর্গার আশীর্বাদ। আমরা জানি, এই প্যান্ডেলটা কলকাতা নয়। এই আলো কলকাতার রাস্তার পুজোর জন্য নয়। এই ভিড়ও সেই কলকাতার ভিড় নয়। তবু কেন জানি না, আগমনীর এই পুজোর মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই আমাদের কলকাতাকে। কারণ কলকাতা শুধু একটা শহরের নাম নয়, কলকাতা একটা অনুভূতি। আর সেই অনুভূতিটাকেই দশ বছর ধরে বয়ে নিয়ে চলেছে আগমনী।

তাই এ বছর দশম বর্ষে দাঁড়িয়ে আগমনীর পুজো আমার কাছে শুধু আরেকটি দুর্গাপুজো নয়। এটা দশ বছরের ভালোবাসার গল্প। দশ বছরের বন্ধুত্বের গল্প। দশ বছরের একসঙ্গে থাকার গল্প এবং আমাদের মতো বহু প্রবাসীদের জন্য বছরের এই তিনটে দিন আগমনীর মধ্যে দিয়ে, নতুন করে একটু কলকাতায় ফিরে যাওয়ার গল্প। হয়তো পুজো শেষে আবার সবাই নিজের নিজের জীবনে ফিরে যাব। আবার অফিস থাকবে, ব্যস্ততা থাকবে, দূরত্বও হবে, কিন্তু এই কয়েকটা দিনের রেশ নিয়ে আবার অপেক্ষায় থাকব আসছে বছরের জন্য।

ADVERTISEMENT