আজকাল ওয়েবডেস্ক: কখনও মেলা প্রাঙ্গণ, কখনও বাসস্ট্যান্ড, কখনও ইকোপার্কের পাশের জমি। পুজোর ঠিকানা বদলেছে বারবার। সঙ্গে এসেছে প্রশাসনিক জটিলতা, বাধা, অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি গড়িয়েছে আদালতের দরজা পর্যন্তও। প্রতিবারই নতুন জায়গা, নতুন করে প্রস্তুতি, আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়া আয়োজন। শেষ পর্যন্ত সেই টানাপোড়েনে একসময় বড় করে পুজো করার ইচ্ছেটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন উদ্যোক্তারা। ২০২৫ সালে তাই মণ্ডপ, প্রতিমা কিংবা থিমের জাঁকজমক নয়—সরস্বতী পুজোর থেকেও ছোট পরিসরে ঘট পুজো করেই প্রতীকী আয়োজন করতে হয়েছিল নিউটাউন সনাতনী দুর্গাপুজোকে।
এক বছর পর ছবিটা বদলেছে। বদলেছে পরিস্থিতি, ফিরেছে উৎসাহও। এ বার আর প্রতীকী আয়োজন নয়। পূর্ণ আয়োজনে, ঘটা করে ফিরছে নিউ টাউনের সনাতনী দুর্গাপুজো। আর প্রত্যাবর্তনের সেই গল্পে এ বার জুড়ে যাচ্ছে বদলের বাংলার নতুন বার্তাও। পুজোর ভাবনা, ‘সনাতন থেকে বিজ্ঞান’।
অর্থাৎ, শুধু অতীতকে ফিরে দেখা নয়, অতীতের জ্ঞানকে বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। মণ্ডপে তাই কেবল আলোকসজ্জা, প্রতিমা বা চোখধাঁধানো থিম থাকবে না। প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানভাবনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে যোগসূত্র তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। নবপ্রজন্মের কাছে ভারতের প্রাচীন জ্ঞান-ঐতিহ্যকে সহজ ভাষায় নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এ বারের ভাবনার অন্যতম লক্ষ্য।

পুজোর পোস্টার। নিজস্ব চিত্র।
যে পুজো একসময় জায়গার অনিশ্চয়তায় বারবার থমকে গিয়েছিল, সেই পুজোর মণ্ডপেই এ বার শোনা যাবে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের গল্প। একদিকে সনাতন ঐতিহ্য, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তি এই দুই প্রান্তকে এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা। পুজোর ভাবনায় অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের তুলে ধরতে চান উদ্যোক্তারা।
পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা বরুণ বিশ্বাসের কথায়, ইতিহাস ও বিজ্ঞান নিয়ে নানা ধরনের বিতর্কের মধ্যে প্রাচীন ভারতের জ্ঞানচর্চার ধারাকে নতুন প্রজন্মের সামনে সহজভাবে তুলে ধরাই তাঁদের অন্যতম উদ্দেশ্য। তাঁর বক্তব্য, সনাতন ঐতিহ্যকে শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি হিসেবে নয়, জ্ঞান ও অনুসন্ধানের দীর্ঘ ধারার অংশ হিসেবেই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান তাঁরা।
পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রশাসনিক টানাপোড়েনের প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্য উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত বলেন, দুর্গাপুজো আয়োজন করতে প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্ন স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। অতীতে কিছু সমস্যা ছিল। বর্তমানে সেই সমস্যাগুলি মিটে যাওয়ায় ফের পুজোর আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে।

পুজোর প্রস্তুতি। নিজস্ব চিত্র।
এ বারের পুজোর উদ্বোধন ঘিরেও থাকছে বিশেষ আকর্ষণ। উদ্যোক্তাদের তরফে জানানো হয়েছে, নিউটাউন সনাতনী দুর্গাপুজোর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফলে থিমের অভিনব ভাবনার পাশাপাশি উদ্বোধনও এ বার পুজোটিকে আলাদা মাত্রা দিতে চলেছে।
একসময় যেখানে প্রশ্ন ছিল, পুজো আদৌ হবে তো? কোথায় হবে? কতটা হবে? গত বছর যেখানে দেবীর আরাধনা সীমাবদ্ধ হয়েছিল ঘট পুজোয়, এ বার সেই জায়গা থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। বারবার ঠিকানা বদলের ক্লান্তি পেরিয়ে নিউ টাউনের সনাতনী পুজো ফিরছে নিজের পূর্ণ পরিসরে।
এ বার তাই নিউটাউনে শুধু দেবীর আরাধনা নয়, গল্প হবে শিকড়ের। গল্প হবে জ্ঞানের। গল্প হবে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়ার। সনাতন থেকে বিজ্ঞান, অতীতের হাত ধরে ভবিষ্যতের পথে। নিউটাউনের পুজোয় এ বার সেই যাত্রারই প্রতিচ্ছবি।