আজকাল ওয়েবডেস্ক: অস্ত্র শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বন্দুক বা তলোয়ারের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্রের ভয়াল ছবি। কিন্তু হাওড়ার এক প্রান্তিক গ্রামের অন্দরে কান পাতলে যে অস্ত্র তৈরির খচখচ বা ঠুকঠাক শব্দ শোনা যায়, তা রক্ত হিম করা কোনও অপরাধের নয়—বরং তা মহিষাসুরমর্দিনী মা দুর্গার ত্রিনাশিনী অস্ত্রসজ্জার ঝনঝনানি!
প্রাণঘাতী কোনও মারাত্মক অস্ত্র নয়, গঙ্গার ধারের এই সাধারণ গ্রামটির ঘরে ঘরে আজ তৈরি হচ্ছে দেবী প্রতিমার ব্যবহারের তীর-ধনুক আর বল্লম। আর সেই মা দুর্গার অস্ত্র তৈরির সুবাদেই বদলে গেছে হাওড়ার গুটিনগরী ও বোয়ালিয়া গ্রামের কয়েকশ পরিবারের ভাগ্য।
আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগের কথা। হাওড়ার ওই সাদামাটা কৃষিপ্রধান গ্রামের যুবকেরা দু'পয়সা বেশি উপার্জনের আশায় পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। গন্তব্য ছিল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলি। মেহনতি পরিবারের সেই যুবকদের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল নতুন এক পথচলা। কুমোরটুলির মহাজনদের সান্নিধ্যে তাঁরা শিখেছিলেন পাতলা টিনের চাদর মাপমতো কেটে, তাতে সুনিপুণ ভাঁজ দিয়ে খোদাই করার কৌশল। তারপর সেই ধাতুর ওপরেই রং-তুলির ছোঁয়ায় প্রাণ পেত প্রতিমার হাতের নানা অস্ত্র।
প্রথম দিকে উলুবেড়িয়া থেকে প্রতিদিন ভোরে কলকাতায় গিয়ে গভীর রাতে বাড়ি ফেরাটা রীতিমতো যন্ত্রণার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিবার ছেড়ে ভিন শহরে পড়ে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছিল। এই সমস্যার সমাধান সূত্র খুঁজতে গিয়েই গ্রামের কারিগরেরা কলকাতার মহাজনদের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের গ্রামেই ছোট করে কারখানা গড়ার উদ্যোগ নেন। এভাবেই সূচনা হয় হাওড়ার গুটিনগরী ও বোয়ালিয়া গ্রামে প্রতিমার অস্ত্র তৈরির অধ্যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কারিগর ও কারখানার সংখ্যা।
আজ ওই গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে এক অন্য চিত্র। কৃষিকাজের পাশাপাশি বসতবাড়ির একটা অংশ দেওয়াল তুলে আলাদা করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কুটিরশিল্পের কারখানা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেই ঘরগুলো থেকে ভেসে আসে হাতুড়ির পেটাট আর কাটার শব্দ। গ্রামের এক অস্ত্র কারিগর তথা ব্যবসায়ী সঞ্জয় রায় জানান, পুজোর কয়েক মাস আগে কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় রাতজাগাটাই এখানকার রুটিন।
কৃষি পেশার অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এই অস্ত্র তৈরির মজুরিতেই আজ স্বাবলম্বী গ্রামের বহু পরিবার। শুধু নিজেদের পেট চালানোই নয়, এই কাজের উপার্জনেই ছেলে-মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন বাবা-মায়েরা। বস্তাবন্দি হয়ে গুটিনগরী ও বোয়ালিয়া গ্রামের এই নিখুঁত হাতের কাজ ছড়িয়ে পড়ছে কলকাতার কুমোরটুলি থেকে শুরু করে রাজ্যের নানা প্রান্তের মৃৎশিল্পালয় ও দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে। অভাবের গোড়ায় ধূপ জ্বেলে, এই গ্রাম প্রমাণ করেছে—নিষ্ঠা আর পরিশ্রমে শিল্পের ছোঁয়া লাগলে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও কীভাবে সাফল্যের অস্ত্র শানানো যায়।