আজকাল ওয়েবডেস্ক: শারদোৎসবের দিন গোনা শুরু হতেই মহানগরীজুড়ে দেবী দুর্গার আবাহনে নতুন রঙের ছোঁয়া। দীর্ঘ ঐতিহ্য বহনকারী বাগুইআটির রেল পুকুর রোডের দেশবন্ধু নগর সংলগ্ন ‘বাগুইআটি রেলওয়ে পুকুর ইউনাইটেড ক্লাব’ প্রতি বছরই তাদের ভাবনায় দর্শনার্থীদের জন্য তুলে ধরে অভিনব কোনও বার্তা। ডিজিটাল যুগে ফিকে হতে বসা খবরের কাগজের হরফ আর শৈশবের স্মৃতিকেই এবার মণ্ডপসজ্জার মূল হাতিয়ার করেছে তারা। ৭৫ ছুঁইছুঁই ক্লাবটি তাদের ৭৩তম বর্ষে পদার্পণ করে বেছে নিয়েছে এক বিশেষ ভাবনা—‘কোলাজ’। যার মধ্যে দিয়ে সমাজের নানা ভিন্নতার রঙ ও খণ্ডচিত্রকে এক সুতোয় গাঁথাই তাঁদের লক্ষ্য।
শিল্পী সোমনাথ তামলির মূল ভাবনায় ও নিখুঁত কারুকাজে এবার সেজে উঠছে এই মণ্ডপ। এবছর মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহৃত হচ্ছে কয়েক হাজার কেজি পুনঃব্যবহারযোগ্য অর্থাত রিসাইকেল্ড পুরনো খবরের কাগজ। গত ১১ আগস্ট খুঁটি পুজোর পর থেকেই এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে জমা করা শুরু হয়েছিল কেজি কেজি পুরনো খবরের কাগজ। সেই সমস্ত পুরনো কাগজ, ছাপা হরফ, সাদাকালো ছবি আর কাগজের বুনোট ব্যবহার করেই তৈরি হচ্ছে এক অন্য স্বাদের প্রতিমা ও শৈল্পিক পরিবেশ।
‘কোলাজ’ থিমের নেপথ্যে রয়েছে পুরাণ বর্ণিত দেবী দুর্গার সৃষ্টির গভীর ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক তাৎপর্য। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, মহিষাসুর বধের জন্য একক কোনো শক্তির পর্যাপ্ততা ছিল না। তাই ব্রহ্ম, বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র, বরুণ, বায়ু, অগ্নি, যম, কুবের এবং সূর্যের মতো দেবতারা তাঁদের নিজস্ব তেজ ও অস্ত্র প্রদান করেছিলেন। এই সকল স্বতন্ত্র শক্তির পুঞ্জীভূত রূপই হলেন দেবী দুর্গা। মণ্ডপজুড়ে এই পৌরাণিক ঘটনাটিকে তুলে ধরা হয়েছে একতা ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীক হিসেবে। ছোট ছোট টুকরো কীভাবে একত্রিত হয়ে একটি বৃহৎ এবং অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয়—সেটাই এই থিমের মূল বার্তা।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা শ্রেয়, শুধু পৌরাণিক কাহিনীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি মণ্ডপের ভাবনা। মণ্ডপ অভ্যন্তরে সমান গুরুত্বে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলা তথা ভারতের সংস্কৃতি ও সামাজিক রূপান্তরের কান্ডারীরা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সত্যজিৎ রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মাতঙ্গিনী হাজরা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং স্বামী বিবেকানন্দের মতো মহান ব্যক্তিত্বদের অবদান ও আদর্শকে একত্রিত করে তুলে ধরা হয়েছে অপর এক ‘কোলাজ’-এ। কারণ,তাঁদের ভাবনা ও ত্যাগের উপর ভিত্তি করেই গঠিত হয়েছে আমাদের আজকের সমাজ।
শুধু তাই নয়, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও পুরনো স্মৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে মণ্ডপে তৈরি করা হয়েছে বেশ কিছু বিশেষ দৃশ্য। সাইকেলে করে ভোরে বাড়ি বাড়ি পেপার দেওয়া, ছাপাখানা থেকে থোকে থোকে কাগজ নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য রূপায়িত করা হয়েছে শিল্পকর্মের মাধ্যমে। ডিজিটাল মাধ্যমে নিমেষে খবর পৌঁছে যাওয়ার এই যুগে, সকালের চা-এর কাপে খবরের কাগজের গন্ধ যে আবেগ তৈরি করত, সেই নস্টালজিয়াকেই উসকে দিচ্ছে এই প্রয়াস।
এই অভিনব আয়োজন সম্পর্কে বাগুইআটি রেলপুকুর ইউনাইটেড ক্লাবের সম্পাদক স্নেহাশিস দেবনাথ জানান, ‘আমাদের পুজো ৭৩তম বর্ষে পদার্পণ করল। এবছর ‘কোলাজ’ থিমের মাধ্যমে আমরা আমাদের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি এবং সম্মিলিত স্মৃতির ছোট ছোট টুকরোকে একসঙ্গে বেঁধে একটি বড় চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছি। যেমন বিভিন্ন দেবতার তেজে দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়েছিল, ঠিক তেমনই প্রতিটি মানুষের ছোট ছোট অবদান একত্রিত হয়ে এক একটি বড় পরিবর্তন আনে। হাজার হাজার কেজি খবরের কাগজ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা পাঠাভ্যাস ও সংবাদপত্র পাঠের সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকেও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং একত্রিত হওয়ার শক্তিই আমাদের এবারের প্রধান বার্তা।’ পুজো কমিটির সদস্য গৌরব বিশ্বাস তাঁদের থিম সম্পর্কে জানান, ‘দেবী দুর্গা যেমন সর্বশক্তির মিলনক্ষেত্র, তেমনই সমাজের ছোট ছোট একক ও মানুষের অবদান একসঙ্গে মিলে যে বড় কিছু তৈরি হতে পারে, তা-ই আমাদের এই ‘কোলাজ’। মায়ের পৌরাণিক রূপের সঙ্গে শিল্প ও সামাজিক স্মৃতির এই মেলবন্ধন এবার দর্শনার্থীদের এক আলাদা অনুভূতি দেবে।’ একইসঙ্গে ক্লাব কর্তৃপক্ষ এ আশাও করছেন,শারদোৎসবে শিল্প, পৌরাণিক ঐতিহ্য ও নস্টালজিয়ার এই বিরল মেলবন্ধন দেখতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় হবে মণ্ডপে।