Loading...

চারশো বছরের ঐতিহ্য আজও অটুট, সাবেকিয়ানায় মেতে ওঠে সবংয়ের ভুঁইয়া বাড়ির দুর্গাপুজো

আজকাল ওয়েবডেস্ক: সময় বদলেছে, বদলেছে প্রজন্ম। কিন্তু বদলায়নি রীতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই পরম্পরা মেনে আজও দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং ব্লকের দশগ্রাম এলাকার কোলন্দা গ্রামের ভুঁইয়া বাড়িতে। ইতিহাস, পারিবারিক বিশ্বাস, লোককথা এবং সাবেকিয়ানার মেলবন্ধনে এই পুজো আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, ভুঁইয়া বাড়ির এই দুর্গাপুজো তাঁদের ত্রয়োদশ প্রজন্মের পুজো। চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে একই নিয়ম ও আচার মেনে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। পুজোর কয়েকটি দিন তাই শুধু পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না উৎসবের আনন্দ। গোটা গ্রামজুড়েই ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ।

ADVERTISEMENT

ভুঁইয়া বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনাকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। কথিত আছে, কন্দর্পনারায়ণ ভূপাল দাস ভুঁইয়া বর্গীদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে কেলেঘাই নদীর পাড়ে এসে বসতি গড়েছিলেন। সেখানেই শুরু হয়েছিল দেবী দুর্গার আরাধনা। সময়ের সঙ্গে প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু সেই পুজোর পরম্পরা আজও ধরে রেখেছেন পরিবারের উত্তরসূরিরা।

আরও পড়ুন

একসময় টেরাকোটার মন্দিরেই দেবীর পুজো হত। কালের নিয়মে সেই প্রাচীন মন্দির এখন অনেকটাই ভগ্নপ্রায়। মন্দিরের কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও পুজোর রীতিতে কোনও পরিবর্তন আসেনি। পূর্বপুরুষদের দেখানো পথেই আজও নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা করেন পরিবারের সদস্যরা।

এই পুজোকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও রয়েছে গভীর বিশ্বাস। বাসিন্দাদের একাংশের বিশ্বাস, নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর কাছে মানত করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই পুজোর দিনগুলিতে ভুঁইয়া বাড়ির গড়ে ভিড় জমান আশপাশের বহু মানুষ।

ভুঁইয়া বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য পরিবারের কুলদেবতার উপস্থিতি। দুর্গামণ্ডপের পাশেই রয়েছেন কুলদেবতা শ্যামসুন্দর জীউ ও শ্রী রাধিকা। পরিবারের প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, বহু বছর আগে পরিবারের এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। সেই স্বপ্নাদেশেই কুলদেবতা পরিবারের কাছাকাছি থাকার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর দুর্গামন্দিরের পাশেই তাঁদের প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই থেকে দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি প্রতিদিন নিয়ম মেনে কুলদেবতার পুজোও হয়ে আসছে।

ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে ভুঁইয়া বাড়ির নিজস্ব রীতি। বাজার থেকে কেনা মিষ্টি দেবীকে নিবেদন করা হয় না। বাড়ির সদস্যরাই নিজেদের হাতে মিষ্টান্ন তৈরি করেন। সেই মিষ্টিই ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় দেবীকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতিতেও আজও কোনও ছেদ পড়েনি।

নবমীর দিন এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ কুমারী পুজো। সকাল থেকেই বাড়িতে শুরু হয়ে যায় বিশেষ প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও এই আয়োজনে অংশ নেন। পুজো ঘিরে বাড়ির আঙিনা পরিণত হয় মিলনক্ষেত্রে।

চারশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোলন্দার ভুঁইয়া বাড়ির দুর্গাপুজো তাই শুধুমাত্র একটি পারিবারিক উৎসব নয়। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং গ্রামীণ বাংলার সাবেক পুজো-সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বেঁধে আজও এগিয়ে চলেছে এই প্রাচীন দুর্গারাধনা।

ADVERTISEMENT