Loading...

সাধারণ হিসাবরক্ষকের কন্যা আজ ভক্তদের ‘মা করুণাময়ী’, বহরমপুরের বিষ্ণুপুর কালীবাড়ির অলৌকিক ইতিহাস জানলে গায়ে কাঁটা দেবে

আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুর্শিদাবাদের বহরমপুর শহরের ভিড় থেকে একটু দূরে, কিন্তু ভক্তদের মনের একেবারে কাছে, বিষ্ণুপুরের মা কালী। স্থানীয়রা বলেন ‘করুণাময়ী মা।’

আজও মানুষের মনে বিশ্বাস, মা করুণাময়ী কাউকে খালি হাতে ফেরান না। তাই সারা বছর, সকাল থেকে সন্ধ্যা, মায়ের চরণে ভিড় লেগেই থাকে মানত আর প্রার্থনার।

ADVERTISEMENT

অলৌকিক কাহিনি, ইতিহাস আর ভক্তির এক অদ্ভুত মিশেল এই মন্দির। বহরমপুর সহ গোটা মুর্শিদাবাদবাসীর কাছে অত্যন্ত জাগ্রত এই কালী মন্দির ঘিরে রয়েছে এমন এক কাহিনি, যা শুনলে আজও অবাক হতে হয়।

আরও পড়ুন

লোকমুখে শোনা যায়, এই মন্দির প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো। ইতিহাস বলছে, এই মন্দিরের মা কালী আসলে ছিলেন কাশিমবাজারের রাজার হিসাবরক্ষক কৃষ্ণেন্দু হোতার নিজের কন্যা।

কৃষ্ণেন্দু হোতা থাকতেন বহরমপুরের সৈদাবাদ অঞ্চলে। তাঁর মেয়ের নাম ছিল করুণাময়ী। তার বয়স তখন ১২-১৩ বছর। একদিন করুণাময়ী বাবার কাছে বায়না ধরে, সে বাবার কাজের জায়গা, কাশিমবাজার রাজবাড়ি দেখতে যাবে।

কয়েকশো বছর আগে তখন কাশিমবাজার ও সৈদাবাদ অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। কৃষ্ণেন্দু প্রথমে মেয়েকে বোঝান, এতটা রাস্তা জঙ্গলের পথে যাওয়া যাবে না। কিন্তু মেয়ে তাঁর কথা মানতে নারাজ। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে হাঁটা পথে জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই মেয়েকে নিয়ে রওনা দেন তিনি।

কাশিমবাজার রাজবাড়ি যাওয়ার পথে যখন তাঁরা বর্তমানের হোতা সাঁকো সংলগ্ন শ্মশানের কাছে এসে পৌঁছান, তখন করুণাময়ী হাঁটতে না পারার কারণে কান্না জুড়ে দেন। ঠিক সেই সময় ওই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলেন এক শাঁখা বিক্রেতা।

তিনি করুণাময়ীকে কাঁদতে দেখে কারণ জিজ্ঞেস করেন। কৃষ্ণেন্দু সবটা জানালে শাঁখা বিক্রেতা বলেন, তিনি তাঁর মেয়েকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। কৃষ্ণেন্দু ভরসা করে মেয়েকে তাঁর হাতে দিয়ে রাজবাড়ির দিকে হাঁটা দেন।

এরপর যা ঘটে, তা লোকশ্রুতি হিসেবে পরিচিত হলেও গায়ে কাঁটা দেওয়ার মত ঘটনা। বাবা চলে যেতেই করুণাময়ী পাশের দিঘিতে ঝাঁপ দেন।

জলের মধ্যে থেকেই শাঁখা বিক্রেতাকে বলেন, জলে নেমে তাঁকে শাঁখা পরিয়ে দিতে। শাঁখা বিক্রেতা বারবার অনুরোধ করেও তাঁকে জল থেকে তুলতে পারেননি। জলে নেমে করুণাময়ীকে শাঁখা পরিয়ে দিতে বাধ্য হন তিনি ।

এরপর করুণাময়ী বলেন, তাঁর বাড়িতে গিয়ে রান্নাঘরে রাখা দশটি রুপোর মুদ্রা যেন তিনি শাঁখার দাম হিসেবে নিয়ে নেন। এই বলে তিনি জলেই থেকে যান।

শাঁখা বিক্রেতা কাঁদতে কাঁদতে করুণাময়ীর বাড়িতে পৌঁছে সব ঘটনা জানান। আশ্চর্যের বিষয়, বাড়ির কেউই ওই রুপোর মুদ্রার কথা জানতেন না। কিন্তু করুণাময়ীর বলে দেওয়া জায়গায় সত্যিই দশটি রুপোর মুদ্রা দেখা যায়।

সঙ্গে সঙ্গে সকলে ছুটে আসেন সেই দিঘির পাড়ে। কিন্তু কোথাও করুণাময়ীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বদলে বেলগাছের কাছে খুঁজে পাওয়া যায় ঠিক করুণাময়ীর মতো দেখতে মা কালীর একটি পাথরের মূর্তি।

অনেকে মনে করেন, মা করুণাময়ী যখন জল থেকে উঠে আসছিলেন, তখন একজন রাখাল তাঁকে দেখে ফেলে। মা যতদূর জল থেকে উঠেছিলেন, বিষ্ণুপুর কালীবাড়িতে মায়ের মূর্তি ঠিক ততটাই, কোমর পর্যন্তই ভক্তরা দেখতে পান। আজও মায়ের মূর্তি কোমর পর্যন্তই পূজিত হয়।

বিগত বহু বছর ধরে এই মন্দিরে পশুবলি প্রথা চলে আসলেও ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সেই প্রথা বন্ধ করে দিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের কথায়, ‘আমাদের মনে হয় মানুষ শান্তির জন্য মায়ের কাছে আসেন। তাই সেখানে কোনও রকম হত্যালীলা মোটেই কাম্য নয়। ভক্তি ভরে মায়ের কাছে কিছু চাইলে মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না।’

এই মন্দির ঘিরে আরও অনেক অলৌকিক কাহিনি আজও শোনা যায়। একবার এক ভক্ত মাকে কিছু উৎসর্গ করবেন বলে মানত করেও ভুলে যান। এরপর হঠাৎ তাঁর ছেলে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে।

মানতের কথা মনে পড়তেই তিনি তা পূর্ণ করেন এবং অলৌকিকভাবে ছেলে আবার কথা বলতে শুরু করে। লোকমুখে শোনা যায়, অনেকেই রাতের বেলা মাকে লাল-সাদা শাড়ি পরে মন্দির চত্বরে ঘুরে বেড়াতেও দেখেছেন।

মন্দিরের সদস্যরা জানান, প্রতি বছর মাঘ মাসে রটন্তি কালীপুজো এবং কার্তিক মাসে দীপান্বিতা কালীপুজো ধুমধাম করে পালিত হয় এখানে। রীতি মেনে এই বছরও ৮ নভেম্বর দীপান্বিতা কালীপুজো হবে। পরদিন সকাল থেকে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হবে। এই মন্দিরের কালী প্রতিমাকে নিত্য পুজো করা হয় এবং মায়ের কখনও নিরঞ্জন হয় না।

কেউ ইতিহাস বলে, কেউ লোকগাঁথা। কিন্তু বহরমপুরের বিষ্ণুপুর কালীবাড়ি এলে একটা কথা সবাই মানেন, এখানে মা আছেন। তা সে কন্যা রূপেই হোক বা করুণাময়ী মা রূপে। তাই আজও ভক্তের বিশ্বাসে, বেলগাছের ছায়ায় জেগে আছে ৫০০ বছরের এক অলৌকিক ইতিহাস।

ADVERTISEMENT