আজকাল ওয়েবডেস্ক: আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলেছে সময়, বদলেছে সমাজ। কিন্তু কয়েকশো বছরের পুরনো ঐতিহ্য ও ধর্মীয় প্রথায় আজও কোনও ছেদ পড়েনি। শিলিগুড়ি - আসামগামী জাতীয় সড়কের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা জলপাইগুড়ির গোশালা মোড়ের ঐতিহাসিক দেবী চৌধুরানি শ্মশান কালী মন্দিরে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় কালী পুজো। আর এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দেবীর ভোগে শোল মাছের উপস্থিতি। কথিত রয়েছে, দেবী চৌধুরানির অত্যন্ত প্রিয় ছিল এই মাছ। সেই বিশ্বাস ও পরম্পরা মেনেই আজও মায়ের কাছে নিবেদন করা হয় শোল মাছের ভোগ।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ৩০০ বছরেরও বেশি আগে ভবানী পাঠক এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এক সময় জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর থেকে রংপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। সেই সময় ভবানী পাঠক ও তাঁর অনুগামীরা এই অঞ্চলে বসবাস করতেন বলে কথিত রয়েছে। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল এই মন্দিরের পুজো। তবে মন্দিরটি দেবী চৌধুরানির নামে পরিচিত হওয়ার পিছনেও রয়েছে এক আকর্ষণীয় ইতিহাস ও লোককথা। কথিত রয়েছে, অধুনা বাংলাদেশের এক জমিদার পরিবারের মেয়ে ছিলেন দেবী চৌধুরানি। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে তাঁকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়নি। এরপর এক রাতে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে তিনি আশ্রয় নেন ভবানী পাঠকের কাছে। ভবানী পাঠক তাঁকে কন্যার মর্যাদায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর কাছেই অস্ত্র চালনার শিক্ষা নিয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন দেবী চৌধুরানি। ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে ছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দেবী চৌধুরানি’তেও এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের উল্লেখ পাওয়া যায়।
মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে আরও নানা রহস্যময় কাহিনি। কথিত আছে, লুট করে আনা সম্পদ মন্দিরের মূর্তির নীচে তৈরি গোপন সুড়ঙ্গে রাখা হতো। মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলপাইগুড়ি শহরের করলা নদীর ধারে বাঁধা থাকত বজরা। ইতিহাস, লোককথা আর ধর্মীয় বিশ্বাসের মেলবন্ধনে আজও এই মন্দির ঘিরে মানুষের কৌতূহল অটুট।
কালীপুজোর রাতে এই মন্দিরে বিশেষ নিয়ম মেনে চলে আরাধনা। প্রথমে মূল পুজো, এরপর বলির প্রথা। মধ্য রাতে তান্ত্রিক উপাচার মেনে শুরু হয় বিশেষ পুজো, যা চলে ভোররাত পর্যন্ত। এখনও প্রথা মেনে পাঠা বলি দেওয়া হয়। মায়ের ভোগের তালিকাতেও রয়েছে বিশেষত্ব। সাদা ভাত, ডাল, বিভিন্ন তরকারি, পাঁচ রকমের ভাজা, শাকভাজা, পায়েস, চাটনি ও মিষ্টির পাশাপাশি নিবেদন করা হয় শোল ও বোয়াল মাছ।
মন্দিরের পুরোহিতের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। কথিত রয়েছে, প্রথম পুরোহিত ছিলেন স্বয়ং ভবানী পাঠক। পরবর্তীতে নয়ন কাপালিক এই মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব সামলান। বর্তমানে সেই দায়িত্বে রয়েছেন সুভাষ চৌধুরী। তিনি জানান, নিত্য পুজোর পাশাপাশি কালী পুজোর রাতে বিশেষ আয়োজন করা হয়। দেবী চৌধুরানির স্মৃতি ও প্রচলিত বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে আজও শ্মশানকালীর ভোগে রাখা হয় তাঁর প্রিয় শোল ও বোয়াল মাছ। গত করোনা পরিস্থিতির কারণে মন্দির কর্তৃপক্ষ প্রসাদ বিতরণ বন্ধ রেখে ছিলেন। তবে এবার কোনও বিধিনিষেধ না থাকায় ভক্তদের মধ্যে ভোগের প্রসাদ বিতরণ করা হবে। ফলে পুজোকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলে গেলেও জলপাইগুড়ির দেবী চৌধুরানি শ্মশান কালী মন্দিরে আজও বেঁচে রয়েছে ইতিহাস, কিংবদন্তি আর কয়েকশো বছরের ধর্মীয় পরম্পরা। আর সেই ঐতিহ্যের অন্যতম সাক্ষী হয়ে প্রতি বছর মায়ের ভোগে ফিরে আসে শোল মাছ।