আজকাল ওয়েবডেস্ক: কল্পনার 'অবান্তর' স্থাপত্য নয়। ডিমের ছাতা কিংবা জুতোর আদলে মণ্ডপও নয়। পঞ্চাশতম বর্ষে সল্টলেকের ইসি ব্লকের পুজো ফিরছে মহাকাব্যের পাতায়। মণ্ডপের বিশাল ক্যানভাসজুড়ে এবার ফুটে উঠবে মহাভারত। থিমের নাম 'অক্ষয়িনী'। মহাভারতের আঠারোটি পর্বকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে সাজানো হচ্ছে গোটা মণ্ডপ।
পুজো মানেই এখন থিমের চমক। প্রতি বছরই শহরের মণ্ডপে দেখা যায় কখনও কোনও স্থাপত্যের আদল, কখনও সামাজিক বার্তা, কখনও সম্পূর্ণ কাল্পনিক কোনও জগৎ। সেই প্রবণতা থেকে কিছুটা সরে গিয়ে এবার মহাকাব্যের আশ্রয় নিয়েছে সল্টলেকের ইসি ব্লক রেসিডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। পুজোর ৫০তম বর্ষে তাদের লক্ষ্য শুধু দর্শক টানা নয়, দর্শকদের সামনে তুলে ধরা মহাভারতের বিশাল আখ্যান।
অক্ষয়িনী থিম এর মাধ্যমে মহাভারতের ১৮ পর্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই পুজো মণ্ডপে এসে দর্শনার্থীরা মহাভারতের পরিচিত চরিত্র, তাদের দ্বন্দ্ব, সম্পর্ক, সংঘাত এবং কুরুক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া সেই দীর্ঘ আখ্যানের নানা অধ্যায় দেখতে পাবেন। অর্থাৎ মণ্ডপে ঢোকা থেকে বেরিয়ে আসা পুরো পথটাই হবে এক ধরনের মহাকাব্য পাঠ।
শিল্পীর জানিয়েছেন, বর্তমান প্রজন্মের একটা বড় অংশ এখনও মহাভারত পড়েনি। অথচ মহাভারত শুধু পুরাণ বা যুদ্ধের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজনীতি, নীতি-নৈতিকতা, সম্পর্ক, কর্তব্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানুষের চিরন্তন টানাপোড়েন। মণ্ডপে সেই গল্পগুলিই যদি দৃশ্যের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়, তা হলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মহাভারত জানার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই অক্ষয়িনী।
এই কাজের সঙ্গে শিল্পী সম্রাট ভট্টাচার্যের ব্যক্তিগত আগ্রহও জড়িয়ে রয়েছে। পুরাণ ও মহাকাব্যের আখ্যান নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। বহুবার পুজোর মণ্ডপে অলীক কল্পনার বদলে মহাকাব্যের গল্প তুলে ধরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু নানা কারণে সেই ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার ইসি ব্লকের ৫০তম বর্ষে সেই সুযোগ মিলেছে।
আর এই কাজের জন্য বড় ক্যানভাসও পাচ্ছেন শিল্পী। ইসি ব্লকের সুবিশাল মাঠজুড়ে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। ফলে মহাভারতের মতো বিস্তৃত আখ্যানকে একাধিক স্তরে এবং বড় পরিসরে উপস্থাপনের সুযোগ থাকছে। শুধু মণ্ডপের বাইরের চাকচিক্য নয়, দর্শককে গল্পের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়াই শিল্পীর লক্ষ্য।
শিল্পীর ভাবনায়, মহাভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতা। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাপন বদলেছে, বদলেছে পুজোর মণ্ডপের ভাষাও। কিন্তু মহাভারতের প্রশ্নগুলি আজও একই রকম- ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, কর্তব্য কী, আপনজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় কি না, ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা কোথায়? সেই প্রশ্নগুলিই এবার মণ্ডপের ভাষায় দর্শকের সামনে আসবে।
ইসি ব্লকের পুজোর উদ্যোক্তাদের আশা, ৫০তম বর্ষে এই ব্যতিক্রমী ভাবনা দর্শকদের আলাদা অভিজ্ঞতা দেবে। থিমের চমক থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন। পুজোর ভিড়ে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও দর্শক যদি থমকে দাঁড়ান, মহাভারতের কোনও চরিত্র বা কোনও আখ্যান সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়- সেটাকেই সাফল্য হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
পঞ্চাশ বছরের পুজোয় তাই ইসি ব্লকের ‘অক্ষয়িনী’ শুধুই একটি থিম নয়। এক অর্থে পুরনো মহাকাব্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস।