৩৯ বছরের বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি উপনগরী সর্বজনীন দুর্গোৎসবে শিল্পী পার্থ জোয়ারদারের ভাবনায় ফুটে উঠছে বিস্মৃত সভ্যতার শিল্পরূপ। অতীত কখনও সত্যিই হারিয়ে যায় না। সময়ের স্তরে স্তরে চাপা পড়ে থাকা ইতিহাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানুষের স্মৃতি কোনও না কোনওভাবে ফিরে আসে নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে। সেই ভাবনাকেই শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছে বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি উপরনগরী সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির ৩৯ বছরের পুজো, যার এবারের ভাবনা ‘অন্তর্লীন’।
শিল্পী পার্থ জোয়ারদারের ভাবনায় নির্মিত এই মণ্ডপে দর্শকদের সামনে উঠে আসছে মাটির গভীরে চাপা পড়ে থাকা এক বিস্মৃত সভ্যতার কাহিনি। সভ্যতার জন্ম, বিকাশ এবং সময়ের প্রবাহে তার হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাসকে মণ্ডপসজ্জার বিভিন্ন স্তরে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
‘অন্তর্লীন’-এর ভাবনায় মণ্ডপে প্রবেশ যেন শুধুমাত্র একটি পূজামণ্ডপ দর্শন নয়, বরং এক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা। প্রতিটি ধাপকে ভাবা হয়েছে এক একটি খননস্তর হিসেবে। ভাঙা স্থাপত্য, মাটির স্তর এবং বিভিন্ন শিল্পরূপের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে অতীতের নীরব সাক্ষ্য।
শিল্পী পার্থ জোয়ারদারের ভাবনায়, ইতিহাসের নিঃশব্দ শ্বাস, মানুষের স্বপ্ন, শিল্পের স্পর্শ এবং সংস্কৃতির স্মৃতি কখনও সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। সময়ের গভীরে তারা অন্তর্লীন হয়ে থাকে এবং অপেক্ষা করে নতুন অন্বেষণ ও নতুন জাগরণের।
এই শিল্পভাবনার পরিণতিতে নীরব ইতিহাসের বুক চিরে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। এখানে দেবী শুধুমাত্র শক্তির প্রতীক নন; তিনি সৃষ্টি, পুনর্জন্ম এবং নবজাগরণের প্রতীক হিসেবেও উপস্থিত। ধ্বংসের মধ্যেও যে সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে এবং বিস্মৃতির গভীরেও যে ভবিষ্যতের বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে—‘অন্তর্লীন’ সেই বার্তাই তুলে ধরে।
৩৯ বছরের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি উপনগরী সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির এবারের উপস্থাপনা তাই ঐতিহ্য ও সমকালীন শিল্পভাবনার এক মেলবন্ধন। অতীতের ধ্বংসাবশেষ থেকে বর্তমানের শিল্পসৃষ্টি এবং সেখান থেকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—‘অন্তর্লীন’ সেই ধারাবাহিকতাকেই সামনে আনে।
‘অন্তর্লীন’ তাই শুধুমাত্র একটি পুজোর থিম নয়। এটি সময়, স্মৃতি, সভ্যতা এবং মানবতার এক শিল্পিত পুনর্পাঠ—যেখানে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা অতীত নতুন শিল্পভাষায় ফিরে আসে এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকেই জন্ম নেয় নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা।