আজকাল ওয়েবডেস্ক: কারাবাসের সময় যে কাজ তাঁকে মানসিক প্রশান্তি জোগাত, দক্ষিণ দিনাজপুরের মৃৎশিল্পী রাজু সরকার সেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরির শখকেই এখন পেশায় পরিণত করেছেন।
আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পাওয়ার পরেও, ৪৫ বছর বয়সী রাজু সেই সংশোধনাগারের সঙ্গে নিজের যোগাযোগ বজায় রেখেছেন, প্রায় তিন মাস বন্দি ছিলেন রাজু।
প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে বালুরঘাট কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের জন্য দুর্গাপ্রতিমা তৈরির বরাত পান রাজু। এ বছর রায়গঞ্জ জেলা সংশোধনাগারও রাজুর হাতের তৈরি দুর্গাই পুজো করা হবে। পাশাপাশি, বুনিয়াদপুর ও জেলার পার্শ্ববর্তী এলাকার বেশ কয়েকটি পুজো কমিটির জন্যও তিনি প্রতিমা তৈরি করছেন।
বুনিয়াদপুর শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের শেরপুরের বাসিন্দা রাজু ছোটবেলা থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০১৮ সালে। একটি মামলায় তাঁকে কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে থাকতে হয়েছিল। বন্দি থাকাকালীন তাঁকে সংশোধনাগারের জন্য দুর্গাপ্রতিমা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সেখানে মাটির পিণ্ডকে দেবীর মূর্তিতে রূপ দেওয়ার কাজে তিনি নিজেকে পুরোপুরি নিমগ্ন রাখেন। মানসিক টানাপড়েনের সেই কঠিন সময়ে এই কাজ তাঁকে ব্যস্ত থাকতে এবং কিছুটা মানসিক শান্তি পেতে সাহায্য করেছিল। পরবর্তীকালে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে রাজু সরকার মুক্তি পান এবং আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করে। তবে সংশোধনাগারের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিমা তৈরির বিষয়টি তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থেকে যায়।
মৃৎশিল্পী রাজু বলেন, "ছোটবেলা থেকেই আমি প্রতিমা তৈরি করছি, তবে নিজের কর্মশালা গড়ে তোলার পর ২০১৯ সালে পেশাদারভাবে কাজ শুরু করি। এ বছর আমার তৈরি প্রতিমা বালুরঘাট ও রায়গঞ্জ সংশোধনাগার, বালুরঘাটের মহামায়া ক্লাব এবং বুনিয়াদপুর ও তার আশেপাশের আরও কয়েকটি জায়গায় পুজো করা হবে। ২০১৮ সালে বালুরঘাটের সংশোধনাগারে তিন মাস কাটানোর সময় পুজোর আগে আমি সেখানে প্রথমবার প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। সেখানকার দায়িত্বে থাকা আধিকারিক পরে রায়গঞ্জে বদলি হয়ে যান এবং আমাকে সেখানকার সংশোধনাগারের জন্যও প্রতিমা তৈরির নির্দেশ দেন।"
সংশোধনাগার থেকে বেরিয়ে এলেও রাজু জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। তাঁদের অনুরোধে তিনি বার্ষিক দুর্গাপুজোর জন্য প্রতিমা তৈরির কাজ চালিয়ে গিয়েছেন।
শিল্পী রাজু সরকার ঐতিহ্যবাহী ‘একচালা’ দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেন, যেখানে সব দেব-দেবীকে একটি কাঠামোর ওপর স্থাপন করা হয় এবং প্রতিমাটি ‘ডাকের সাজ’-এর বিশেষ সজ্জায় সজ্জিত থাকে। তাঁর স্ত্রী পূজাও তাঁর সঙ্গে কাজ করেন। অত্যন্ত যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিমাগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে তিনি সহায়তা করেন। পূজার কথায়, “প্রতিমাশিল্পী হিসেবে রাজু এখন বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। নানা জায়গা থেকে তাঁর কাছে কাজের বরাত আসে। আমিও তাঁর কাজে সাহায্য করি।”
দুর্গাপুজো এগিয়ে আসায় তাঁদের কাজের চাপ বেড়েছে। ফলে বিশ্রামের খুব একটা সময় পাচ্ছেন না এই দম্পতি। রাজু ও পূজার একটি ছেলেও রয়েছে। তা সত্ত্বেও, খড়, মাটি ও রঙের পর্যায়ক্রমিক প্রলেপ দিয়ে দেবীর রূপকে জীবন্ত করে তুলতে তাঁরা অত্যন্ত যত্নসহকারে প্রতিমা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।