আজকাল ওয়েবডেস্ক: বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী বীরহাটার বড়মা কালীর পুজো ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা তুঙ্গে। মায়ের ঝুলিতে থাকে স্মার্টফোন ও স্মার্টওয়াচও!
বর্ধমানেও রয়েছে বড়মা কালীর মন্দির। বীরহাটার এই কালীপুজো ঘিরে এক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়। দুরদুরান্ত থেকে আসেন ভক্তরা।
দীপাবলির আলোর উৎসবে মেতে উঠেছে গোটা বাংলা, আর তারই মাঝে পূর্ব বর্ধমানের বীরহাটা কালীবাড়ি ট্রাস্টের পরিচালনায় ঐতিহ্যবাহী 'বড়মা' কালীর পুজো ঘিরে ভক্তদের ঢল নেমেছে। ভোর থেকেই মায়ের মন্দিরে উপচে পড়ছে পুণ্যার্থীদের ভিড়। স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিত মায়ের অপরূপ মূর্তি দর্শন করে এবং পুজো দিয়ে মনের মনস্কামনা পূরণ করতে আসছেন অগণিত মানুষ।
ভক্তদের কাছে বীরহাটার এই বড়মা অত্যন্ত জাগ্রত। রাধারানি সাহা নামে এক ভক্ত জানান, ছোটবেলা থেকে টানা ২০-২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই মন্দিরে আসছেন এবং প্রতিদিনই মায়ের দর্শন করেন। তাঁর কথায়, "এখানে এলে মন শান্তিতে ভরে যায়। মা ভীষণই জাগ্রত। মা শুধু মুখে কথা বলেন না, এছাড়া ওনাকে মন থেকে ডাকলে আমরা সব কিছু পাই।"
প্রাচীন এই মন্দিরের সঠিক ইতিহাস আজও অজানা। ১৯৮৮ সাল থেকে মন্দিরের পূর্ণ দায়িত্বে থাকা প্রধান পুরোহিত দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় জানান, বর্ধমান জেলা পরিষদ, তথ্য সংস্কৃতি কেন্দ্র, ক্যালকাটা গেজেট এবং রাজবাড়ির ইতিহাস ঘেঁটেও এই মন্দির প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট কোনও প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি। তবে এই মন্দির ঘিরে নানা লোকপ্রবাদ ও জনশ্রুতি রয়েছে।
প্রখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ ডঃ সুকুমার সেন এই মন্দিরের পাশেই থাকতেন। তাঁর ভাই তথা রাজ কলেজিয়েট স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক ডঃ সুশীল কুমার সেনের সূত্র ধরে জানা যায়, শের শাহের আমলে যখন জিটি রোড পাকা করার কাজ চলছিল, তখন জনমজুররা প্রাতঃকৃত্য সারতে গিয়ে এই বেদিটি দেখতে পান। আবার অন্য একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, অতীতে তান্ত্রিক মতে সাধনা করা বীরাচারী সন্ন্যাসীরা পায়ে হেঁটে যাতায়াতের সময় বাঁকা নদীর তীরে জঙ্গলে বিশ্রাম নিতেন এবং মাটির কালীমূর্তি গড়ে পুজো করতেন। সেই বীরাচারী সন্ন্যাসীদের নামানুসারেই এই জায়গার নাম হয় 'বীরহাটা' এবং দেবীর নাম হয় 'বীরহাটার কালীমাতা' বা 'বড়মা'।
বীরহাটা কালীবাড়িতে সম্পূর্ণ তান্ত্রিক মতেই মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়। রাতে মূল পুজোর আগে ঘটোত্তোলন এবং ষোড়শোপচারে মায়ের আরাধনা করা হয়। মা এখানে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নতুন করে আর চক্ষুদান বা প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে হয় না। পুরোহিত দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় জানান, আগে এই মন্দিরে প্রচুর পশুবলি হতো এবং ভক্তরা মানসিক শোধ করতে নিজেদের বুকের রক্তদান করতেন। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে মন্দিরে যেকোনও ধরনের রক্তপাত ও পশুবলি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নিয়ম মেনে চালকুমড়ো ও আখ বলির মাধ্যমেই পুজো সম্পন্ন হয়। মায়ের কাছে থাকে স্মার্টফোন, ব্যাগ ও স্মার্টওয়াচ।
এই মন্দিরের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ব্যতিক্রমী বিষয় হল মায়ের আধুনিক উপহার সামগ্রী। সোনার গহনার পাশাপাশি মায়ের হাতে ঝুলতে দেখা যায় ভ্যানিটি ব্যাগ। এমনকী মায়ের নিজস্ব মোবাইল ফোন এবং স্মার্টওয়াচও রয়েছে! পুরোহিত জানান, মোবাইল ফোন যখন প্রথম বাজারে আসে, তখন এক অশীতিপর বৃদ্ধা ভক্ত মাকে ভালবেসে প্রথম একটি ফোন উপহার দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ভক্তরা মাকে স্মার্টফোন উপহার দিয়েছেন। গত বছরও এক ভক্ত মাকে নতুন ফোন দিয়েছেন, যা এখনও সচল রয়েছে এবং তাতে রীতিমতো ফোনও আসে! এছাড়া এক ভক্ত প্রতি বছর নিয়ম করে মাকে একটি করে স্মার্টওয়াচ উপহার দেন। প্রাচীন ঐতিহ্য, তন্ত্রসাধনার রীতি আর ভক্তদের আধুনিক উপহারের মেলবন্ধনে বর্ধমানের বীরহাটার বড়মা কালীর পুজো আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল।