Loading...

হুঁকোয় তামাক না দেওয়ার অপমান! জমিদারের অভিমান থেকেই সূচনা কালীপুজোর, ১২৭ বছরেও অটুট সেই ইতিহাস

ইন্দ্রজিৎ সাহু: এক টুকরো অভিমান থেকে কখনও ইতিহাসের জন্ম হয়। অপমানবোধ সময়ের সীমানা পেরিয়ে যে একটি জনপদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে, তারই সাক্ষ্য বহন করছে পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড় ব্লকের দুড়িয়া বাটিটাকি গ্রামের কালীপুজো। কথিত আছে, হুঁকোয় তামাক না দেওয়ার ঘটনায় অপমানিত হয়েছিলেন এক জমিদার। আর সেই অভিমান থেকেই নিজের গ্রামে কালীপুজো শুরুর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে ১২৭ বছর। ১৮৯৯ সালে শুরু হওয়া সেই পুজো আজও সমান নিষ্ঠা ও আড়ম্বরে বয়ে নিয়ে চলেছে ইতিহাসের উত্তরাধিকার।

জমিদারি নেই, নেই সামাজিক প্রতিপত্তির চেনা ছবিও। বদলে গিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু দুড়িয়া বাটিটাকির এই কালীপুজো আজও ধরে রেখেছে ইতিহাসের স্মৃতি। এ বছর ১২৭ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পাশের খুড়শি গ্রামে আগে থেকেই প্রাচীন কালীপুজোর প্রচলন ছিল। এক বার সেই পুজোয় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এলাকার জমিদার তরেন্দ্রনাথ দাসকে। তবে কোনও কারণে তিনি নিজে উপস্থিত হতে পারেননি। পরিবর্তে পাঠিয়েছিলেন তাঁর দুই অনুগামী শশী ও বশী ভুঁইয়াকে।

ADVERTISEMENT

সেই সময়ের অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম অঙ্গ ছিল হুঁকোয় তামাক খাওয়ানোর ব্যবস্থা। কিন্তু জমিদারের পাঠানো ওই দুই ব্যক্তিকে প্রত্যাশিত সম্মান ও আতিথেয়তা দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁদের হুঁকোয় তামাকও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। গ্রামে ফিরে তাঁরা জমিদারকে গোটা ঘটনা জানান। বিষয়টি অপমানজনক বলে মনে হয়েছিল তরেন্দ্রনাথের। এরপরই নিজের গ্রামে পৃথক ভাবে কালীপুজো শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়াই নয়, পুজোর স্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য মন্দির নির্মাণে দান করেন ১৪ ডেসিমেল জমি। ১৮৯৯ সালে সেই জমিতেই শুরু হয় দুড়িয়া বাটিটাকির কালী আরাধনা।

আরও পড়ুন

Pujo

পুজোর প্রথম দিকের আয়োজন ছিল একেবারেই সাধারণ। ত্রিপল টাঙিয়ে চলত দেবীর আরাধনা। পরে মাটির দেওয়াল ও টালির ছাউনি দিয়ে তৈরি হয় ছোট্ট মন্দির। পুজোর সঙ্গে যুক্ত হন গ্রামের বহু মানুষ। রাখাল নন্দী, তিতারাম ভুঁইয়া, গুণধর দে এবং নীহারকান্ত মাইতির মতো স্থানীয় বাসিন্দারা পুজোর আয়োজনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পরবর্তী সময়ে জমিদার তরেন্দ্রনাথ দাস তাঁর মেজো ছেলে চিত্তরঞ্জন দাসের হাতে পুজো এবং দান করা জমির দায়িত্ব তুলে দেন। সময়ের সঙ্গে প্রকৃতির রোষও সামলাতে হয়েছে এই মন্দিরকে। একবার বন্যায় মাটির তৈরি মন্দির ভেঙে পড়ে। কিন্তু দেবীর আরাধনায় ছেদ পড়েনি। গ্রামবাসীদের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতায় গড়ে ওঠে বর্তমান পাকা মন্দির। সেই থেকেই পুজোর দায়িত্ব ক্রমশ হয়ে ওঠে গোটা গ্রামের সম্মিলিত প্রয়াস।

দুড়িয়া বাটিটাকির কালীপুজোর অন্যতম বিশেষত্ব প্রতিমা বিসর্জনের রীতিতে। সাধারণত কালীপুজোর পরদিনই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে সেই প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। পুজোর পর সারা বছর মন্দিরেই বিরাজ করেন দেবী। পরের বছর নতুন পুজোর ঠিক আগে আগের বছরের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। মন্দিরে অবশ্য সারা বছর নিত্যপুজোর প্রচলন নেই। দেবীর মন্দির এবং প্রতিমার মুখ পূর্বমুখী। আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, প্রতি বছর একই শিল্পীর হাতে নির্মিত হয় দেবীর প্রতিমা। অর্থাৎ সময়ের পরিবর্তন হলেও পুজোর বেশ কিছু প্রাচীন রীতি আজও যত্নের সঙ্গে ধরে রেখেছেন উদ্যোক্তারা।

বর্তমানে দুড়িয়া বাটিটাকি গ্রামীণ পুজো কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এই পুজো। কমিটির সভাপতি শতদল মাইতি এবং সম্পাদক তথা জমিদার পরিবারের সদস্য বিজিত দাস জানান, ১২৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বার ১২৭টি প্রদীপ জ্বালিয়ে পুজোর সূচনা করা হবে। মন্দির সংস্কারের কাজ চলায় এ বছর বড় কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়নি। তবে কালীপুজোর পরের দিন গোটা গ্রামের বাসিন্দাদের একসঙ্গে বসিয়ে খাওয়ানোর বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ADVERTISEMENT