Loading...

মাটির প্রতিমা নেই, বিসর্জনেরও বালাই নেই, শতাব্দীপ্রাচীন কাঁথ কালী বাস করেন দেওয়ালে! মেদিনীপুরের মীরবাজারের ইতিহাস জানলে গায়ে কাঁটা দেবে

আজকাল ওয়েবডেস্ক: কালীপুজো মানেই নতুন প্রতিমা, পুজোর আয়োজন, তারপর বিসর্জন। কিন্তু এই চেনা ছবির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম মেদিনীপুর শহরের মীরবাজার। ফি বছর নতুন মাটির প্রতিমা গড়ে পুজো হয় না এখানে। বিসর্জনেরও কোনও নিয়ম নেই।

মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা দেবীমূর্তিই বছরের পর বছর ধরে পূজিত হয়ে আসছে। প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ বছরের প্রাচীন এই পুজো পরিচিত ‘কাঁথ কালী’ নামে। স্বপ্নাদেশ, ডাকাতদের তন্ত্রসাধনা আর দেওয়ালে ফুটে ওঠা দেবী চিহ্নের কাহিনি ঘিরে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে রয়েছে নানা জনশ্রুতি।

ADVERTISEMENT

মেদিনীপুর শহরের প্রাচীন কালীমন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম এই মন্দির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে শহরের চেহারা, বেড়েছে পুজোর জৌলুস। কিন্তু বদলায়নি দেবীর অধিষ্ঠানস্থল। মন্দিরের দেওয়ালে খোদাই করা মূর্তিই পূজিত হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে।

আরও পড়ুন

কালীপুজোর আগে শুধু নতুন করে রং করা হয় দেওয়াল ও দেবীমূর্তিতে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক শতাব্দী ধরে একই মূর্তিতে পূজিত হয়ে আসছেন দেবী। দেওয়ালে এই স্থায়ী অধিষ্ঠানই এই পুজোকে দিয়েছে ‘কাঁথ কালী’ পরিচিতি।

এই পুজোকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে এক আশ্চর্য কাহিনি। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ডায়মন্ড হারবারের নুনগোলা এলাকার বাসিন্দা নন্দগোপাল মুখোপাধ্যায় একদিন স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে দেবী তাঁকে জানান, মেদিনীপুর শহরের মীরবাজারে তাঁর অবস্থান। সেই নির্দেশ পেয়েই দেবীর সন্ধানে মেদিনীপুরে রওনা দেন তিনি। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর একটি অশ্বত্থ গাছের নীচে পৌঁছন নন্দগোপাল।

কথিত রয়েছে, সেখানে একদল ডাকাত তন্ত্রসাধনায় মগ্ন ছিলেন। কাছেই নজরে আসে একটি ভগ্নপ্রায় দেওয়াল। সেই দেওয়াল খুঁড়তেই নাকি পাওয়া যায় স্বস্তিক চিহ্ন এবং দেবীর হাতের খড়্গের চিহ্ন। মন্দির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সেই চিহ্ন আজও দেওয়ালে বর্তমান। পরবর্তী সময়ে ওই দেওয়ালেই দেবীর মূর্তি খোদাই করে শুরু হয় পুজো। সেই থেকে দেওয়ালের গায়েই স্থায়ী আসন মা কালীর।

কাঁথ কালীমন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এখানে প্রতিমা বিসর্জনের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, পুজোর জন্য প্রতিবছর নতুন করে কোনও প্রতিমা তৈরি করা হয় না। দেওয়ালে খোদাই করা মূর্তিই দেবীর স্থায়ী রূপ। বছরের পর বছর ধরে পুজো করা হচ্ছে সেই মূর্তিই। পুরনো দেওয়াল ও কাঠামো অক্ষত রেখে শুধু রং ও সাজসজ্জার মাধ্যমে নতুন করে উৎসবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

আধুনিকতার যুগে এই ব্যতিক্রমী রীতি দেখতেই প্রতিবছর বহু মানুষ ভিড় জমান মন্দিরে। পুজোর ভোগের আয়োজনও বেশ বড়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, প্রায় দুই কুইন্টাল চাল ও ডাল দিয়ে তৈরি হয় দেবীর ভোগ। পুজো শেষে সেই প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। কালীপুজোর দিন সকাল থেকেই মন্দিরে শুরু হয় দর্শনার্থীদের আনাগোনা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ভক্তদের ভিড়।

মেদিনীপুর শহরের পাশাপাশি আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও বহু মানুষ আসেন দেবীর দর্শনে। এবারও কালীপুজোকে ঘিরে মীরবাজারে শুরু হয়েছে উৎসবের প্রস্তুতি। মন্দির চত্বর সাজিয়ে তোলার কাজ চলছে জোরকদমে। শুরু হয়েছে দেবীমূর্তিতে রং করার কাজ। মন্দির সংলগ্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে প্যান্ডেল। রঙিন আলোয় সাজিয়ে তোলা হচ্ছে মন্দির ও সংলগ্ন এলাকা।

পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সুমনজিৎ দে বলেন, ‘এই পুজোকে ঘিরে এলাকাবাসীর মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা রয়েছে। প্রতিবছর বহু মানুষ এখানে পুজো দিতে আসেন। পুজো উপলক্ষে সামাজিক কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।’ মন্দিরের পুরোহিত শ্যামল ভট্টাচার্য প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে পুজো করে আসছেন।

তাঁর কথায়, ‘এখানে মা অত্যন্ত জাগ্রত। বহু ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে বলে তাঁদের বিশ্বাস। মা এখানে স্নেহময়ী ও শান্তময়ী রূপে পূজিত হন। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ মায়ের কাছে আসেন।’ আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গিয়েছে উৎসবের অনেক রীতি।

কিন্তু মীরবাজারের কাঁথ কালীমন্দিরে আজও অতীতের সেই পরম্পরা অটুট। নেই নতুন প্রতিমা গড়ার ব্যস্ততা, নেই বিসর্জনের আয়োজন। দেওয়ালের গায়েই দেবীর চিরস্থায়ী অধিষ্ঠান। কয়েক শতাব্দী পেরিয়েও এই ব্যতিক্রমী পুজো তাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, মেদিনীপুরের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন।

ADVERTISEMENT