আজকাল ওয়েবডেস্ক: পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী চকদিঘি জমিদারবাড়ির পুজো কেবল আভিজাত্যের ইতিহাস নয়, বরং বাংলার নবজাগরণ ও সংস্কৃতির এক অনন্য দলিল। জমিদারি বিলুপ্ত হলেও প্রায় ৩৭৫ বছরের পুরোনো এই জমিদারবাড়িতে এখনও অমলিন ঐতিহ্য ও প্রথা।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে এই জমিদারি পত্তন হয়। ইতিহাস গ্রন্থ ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ অনুযায়ী, রাজস্থানের বুন্দেলখণ্ডের রাজপুত ক্ষত্রিয় নল সিং কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে নিষ্কর জমিদারি পেয়ে এখানে বসতি গড়েন। দামোদরের পূর্ব তীরের জলাশয় ও দিঘি পরিবেষ্টিত সেই স্থানই পরবর্তীকালে ‘চকদিঘি’ নামে পরিচিত হয়।
তবে চকদিঘির খ্যাতি ও সামাজিক উন্নতির রূপকার ছিলেন প্রজাবৎসল জমিদার সারদাপ্রসাদ সিংহরায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অত্যন্ত স্নেহভাজন এই মানুষটি এলাকার শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রসারে এগিয়ে আসেন। তাঁর উদ্যোগেই চকদিঘিতে বিদ্যালয় তৈরি হয়, যার উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর।
এছাড়া চকদিঘি হাসপাতাল এবং মেমারি-চকদিঘি সড়কপথ নির্মাণেও তাঁর মুখ্য অবদান ছিল। পরবর্তীকালে ললিতমোহন সিংহরায়, লীলামোহন সিংহরায়রা সেই জনকল্যাণমুখী ধারা বজায় রাখেন।
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সিংহরায় পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল গভীর। প্রায়ই তিনি দুর্গাপুজো সহ বিভিন্ন সময়ে একশো বিঘা বিস্তৃত এই বাগানবাটিতে এসে থাকতেন। তাঁর থাকার জন্যই দিঘির পাড়ে তৈরি করা হয়েছিল একটি ‘হাওয়াখানা’, যা আজও ‘হাওয়া মহল’ নামে পরিচিত।
বড় অট্টালিকা, কাছারি বাড়ি, অন্দরমহল আর একাধিক দিঘি পরিবেষ্টিত এই বাগানবাটির পরিবেশ সত্যজিৎ রায়কে মুগ্ধ করেছিল। এখানেই তিনি শুটিং করেছিলেন তাঁর কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘ঘরে বাইরে’-র।
চকদিঘি বাগানবাটির স্থায়ী দুর্গা মন্দিরে প্রায় ২৮৭ বছর ধরে পুজিত হচ্ছেন দেবী দুর্গা। বৈদিক মতে, একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে দেবীর পুজো হয়। দেবীর দু’পাশে থাকে জয়া ও বিজয়ার মূর্তি। প্রতিপদের দিন থেকে শুরু হওয়া এই পুজোয় হুগলী থেকে আসেন কুলপুরোহিত। মন্দির প্রাঙ্গণের প্রতিটি থামে একটি আস্ত নারকেল, আমপল্লব ও কাঁঠালি কলা একসঙ্গে বেঁধে সাজানো হয়।
পুজোর ভোগেও রয়েছে রাজকীয় বৈচিত্র্য। মেওয়া ফলের পাশাপাশি নৈবেদ্যে থাকে চিনির সন্দেশ, ডোনা, নবাত, রশকরা ও মুড়কি। একমাত্র সন্ধিপুজোয় ১০৮টি পদ্ম লাগলেও, বাকি দিনগুলিতে স্থলপদ্মে পুজো হয়।
ঐতিহ্য মেনে সন্ধিপুজোর সময় দুটি মন্দিরেই ব্রাহ্মণ পরিবারের বিধবা মহিলারা ধুনো পোড়ান। আগে পাঁঠা বলির চল থাকলেও তা এখন বন্ধ, পরিবর্তে দেওয়া হয় সন্দেশ।
নবমীর দিন চকদিঘি এবং ৩ কিলোমিটার দূরের মণিরামবাটি- উভয় মন্দিরেই একই সঙ্গে কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়।
জমিদারি প্রথা উঠে গেলেও পরিবারের কড়া নিয়ম এখনও সযত্নে পালন করা হয়। পুজোর জোগাড় থেকে সমস্ত দায়িত্ব সামলান পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই, মহিলাদের সেখানে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ। আভিজাত্য রক্ষায় সিংহরায় পরিবারের মহিলারা আজও পুজোর দিনগুলিতে অন্তরালবর্তিনী থাকেন। অন্দরমহল থেকে মন্দিরে আসা-যাওয়ার সময়ে পথ ঢেকে দেওয়া হয় সুদীর্ঘ কানাতে।
ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সিংহরায় পরিবারের বর্তমান সদস্যরা কলকাতা বা অন্যত্র থাকলেও, পুজোর ক’টা দিন সবাই ফিরে আসেন এই পুরোনো ভিটেতে। পুজোর দিনগুলিতে সাধারণ মানুষের জন্যও খুলে দেওয়া হয় বাগানবাটির দরজা। আর একাদশীর দিন কাঙালী বিদায়ের মধ্য দিয়ে সাঙ্গ হয় শতাব্দীপ্রাচীন এই শারদোৎসব।