৭০০ বছরের রীতি, ‘কোদাখাঁকি’ দুর্গার ভোগে দেওয়া হয় ইলিশ
1/8
দুর্গাপুজো মানেই থিমের চমক, আলোর রোশনাই। তার মাঝেই মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের বহুরা গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজো আজও ব্যতিক্রম। ৭০০ বছরের পুরনো এই পুজোয় নেই আধুনিকতার ছোঁয়া, আছে লোকশ্রুতি, অলৌকিক বিশ্বাস আর একরাশ প্রাচীন রীতি, যা একে অন্য পাঁচটা পুজো থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। এই পুজো স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘কোদাখাঁকি পুজো’ নামে।
2/8
কে প্রথম এই পুজো শুরু করেছিলেন, তার সঠিক ইতিহাস আজ আর কারও মনে নেই। তবে লোকশ্রুতি বলে, বহু শতাব্দী আগে এই গভীর জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় ডাকাতরাই প্রথম মা দুর্গার আরাধনা শুরু করেছিলেন। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে তারা মায়ের কাছে পুজো দিয়ে যেতেন। কালের নিয়মে ডাকাতদের হাত থেকে পুজোর দায়িত্বভার আসে বহুরা গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের হাতে। সেই থেকে বংশ পরম্পরায় আজ ষষ্ঠ প্রজন্ম ধরে এই পুজোকে আগলে রেখেছেন বন্দ্যোপাধ্যায়রা।
ADVERTISEMENT
3/8
এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল মায়ের অভিনব ভোগ। এখানে মাকে অন্ন ভোগ দেওয়া হয় না, ভোগ দেওয়া হয় ঘাস থেকে তৈরি ‘কোদার চাল’, কচুশাক এবং ইলিশ মাছ দিয়ে। এই অদ্ভুত ভোগের পিছনেও রয়েছে এক জনশ্রুতি। বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্মের সদস্য প্রীতিশ বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন সেই কাহিনী।
4/8
তিনি বলেন, “এক সময় ভয়াবহ বন্যায় এলাকার সমস্ত ধানের জমি নষ্ট হয়ে যায়। মায়ের পুজোয় ভোগ দেওয়ার মতো একমুঠো চালও অবশিষ্ট ছিল না। তখন পরিবারের এক সদস্য মায়ের স্বপ্নাদেশ পান, ঘাস থেকে তৈরি ‘কোদার চাল’ দিয়েই যেন মায়ের ভোগ দেওয়া হয়। সেই থেকেই মায়ের পুজোয় ‘কোদার চাল’, কচুশাক এবং ইলিশ মাছ ভোগ হিসেবে দেওয়ার প্রথা চালু হয়। আমরা আজও সেই রীতি নিষ্ঠা সহকারে মেনে চলি।”
ADVERTISEMENT
5/8
শুধু ভোগেই নয়, পুজোর প্রতিটি আচারেই রয়েছে চমক। প্রীতিশবাবু জানান, এই পুজোর বোধন হয় মহালয়ারও সাত দিন আগে। তারপর থেকে টানা ১৫ দিন ধরে চলে চণ্ডীপাঠ। সপ্তমী থেকে শুরু হয় মূল পুজো। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল এখানকার সন্ধিপুজো। ঘড়ি দেখে নয়, প্রদীপের শিখা দেখে নির্ধারিত হয় সন্ধিপুজোর সময়। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে তান্ত্রিক মতে পুজো হয়। সন্ধিপুজোর সময় আমরা প্রদীপের দিকে তাকিয়ে থাকি। প্রদীপের শিখা যখন দক্ষিণ দিকে হেলে যায়, তখনই আমরা বুঝতে পারি সন্ধিপুজোর শুভক্ষণ উপস্থিত। তখনই ঢাকের বাদ্যি আর মন্ত্রোচ্চারণে শুরু হয় সন্ধিপুজো।”
6/8
তান্ত্রিক মতে পুজো হওয়ায় এখানে আজও বলি প্রথা চালু রয়েছে। নবমীর দিন কীর্তন চলাকালীন পাঁঠাবলি দেওয়া হয়। আর বিসর্জনের রীতিও একেবারে আলাদা। দশমীর দিন রাত ১২টা বেজে ১ মিনিটে মাকে আসন থেকে নামানো হয়। তার আগে কোনওভাবেই মাকে আসন থেকে নামানো যায় না, এটাই পরিবারের কঠোর নিয়ম।
ADVERTISEMENT
7/8
শুধু পুজোর ক'দিনই নয়, সারা বছরই এই মন্দিরকে ঘিরে নানা অলৌকিক কাহিনী শোনা যায়। প্রীতিশবাবুর কথায়, “সারা বছরই সাধারণ মানুষ আমাদের পুজো দালানে মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করেন। অনেকেই বলেন, গভীর রাতে সেখানে নুপুরের আওয়াজ শোনা যায়, কখনও আবার মায়ের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। সবটাই শোনা কথা হলেও, আমাদের বিশ্বাস মা ‘কোদাখাঁকি’ আমাদের পরিবার এবং সমগ্র এলাকাবাসীর ওপর তাঁর আশীর্বাদের হাত রেখেছেন।”
8/8
এই বিশেষত্ব এবং রীতি-আচারের টানেই প্রতি বছর দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় জমান বহুরা গ্রামের এই ৭০০ বছরের প্রাচীন পুজো দেখতে। তাঁদের বিশ্বাস, ‘কোদার চালের’ এই প্রসাদ গ্রহণ করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই প্রাচীন পুজো আজও তাই স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
ADVERTISEMENT
সবাই যা পড়ছেন
ADVERTISEMENT