Loading...

পুজোর ভিড়েই মিশে যেতেন ক্ষুদিরাম, বারীন ঘোষ! অম্বিকানগর রাজবাড়ির দুর্গোৎসবে জড়িয়ে স্বাধীনতার গোপন ইতিহাস

আজকাল ওয়েবডেস্ক: কিছু কিছু গল্প আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বাঁকুড়া জেলার রানীবাঁধ ব্লকের অম্বিকানগর গ্রামও তেমনই এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় বহন করে চলেছে। কংসাবতী এবং কুমারী নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত অম্বিকানগরের রাজত্বের পত্তন করেন রাজা খড়গেশ্বর ধবলদেব। এই রাজবংশের ষষ্ঠ পুরুষ রাইচরণ ধবলদেব ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম এক প্রত্যক্ষ নায়ক, যিনি নিজের রাজকীয় সামর্থ্য ও কৌশল কাজে লাগিয়ে বিপ্লবীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

তৎকালীন সময়ে অম্বিকানগরের অদূরে ছেঁদাপাথরের গভীর জঙ্গল ছিল বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে পাহাড়ের গুহায় ষষ্ঠ পুরুষ রাজা রায়চরণ ধবলদেবের তত্ত্বাবধানে চলত বিপ্লবীদের গোপন অস্ত্র প্রশিক্ষণ। রাজা রাইচরণ ধবলদেব কেবল এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের চরিত্র ছিলেন শুধু তাই নয়, তিনি বিপ্লবীদের আশ্রয়, অর্থ এবং নানা সরঞ্জাম দিয়ে গোপনে সাহায্য করে যেতেন। ক্ষুদিরাম বসু, বারীন ঘোষ, প্রফুল্ল চাকী, নরেন গোস্বামীর মতো প্রথম সারির প্রখ্যাত বিপ্লবীরা ছেঁদাপাথরের এই রহস্যময় ও দুর্গম অরণ্যে এসে প্রশিক্ষণ নিতেন।

ADVERTISEMENT

এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে অম্বিকানগর রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো। কংসাবতী এবং কুমারী নদীর সংযোগস্থলে এই অম্বিকানগর রাজবাড়ির পুজো ছিল এলাকাবাসীর কাছে এক গর্বের বিষয়। তৎকালীন সময়ে দুর্গোৎসবের সময় রাজবাড়িতে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটত, চলত খাওয়া দাওয়া। রাজ পরিবারের সদস্যর দাবি জনসমাগমের এই সুযোগকে বিপ্লবীরা ছদ্মবেশে চলাচলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার জন্য ক্ষুদিরাম বসু, বারিণ ঘোষ, নরেন গোঁসাই-সহ একাধিক বিপ্লবী দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে রাজবাড়িতে আসতেন৷ উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন। ভিড়ের মধ্যে তাঁদের চিনতে পারা ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। রাজবাড়ির চত্বরে দাঁড়িয়ে তাঁরা মা দুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিতেন এবং পরাধীন দেশমাতার মুক্তির জন্য প্রার্থনা জানাতেন।

আরও পড়ুন

PUJO

১৬১১ সালে অম্বিকানগর রাজবাড়িতে দুর্গাপুজোর পত্তন হয়। এই পুজোর অন্যতম মূল বিশেষত্ব হল দেবী দুর্গার সনাতনী একচালার প্রতিমা। ঐতিহ্য মেনে দেবী এখানে একচালার মূর্তিতেই অধিষ্ঠান করেন। ষষ্ঠীর হোম যজ্ঞ থেকে অঙ্গারের কাজল তৈরি হয়। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে বলিদান, অষ্টমীতে গর্জে ওঠে তোপধ্বনি। প্রত্যেকদিন নতুন মাটির হাঁড়িতে রান্না করে মাকে খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয়।

অম্বিকানগর রাজবাড়ির বর্তমান দৈহিত্র গৌরীশংকর নারায়ণ দেব জানান, “তৎকালীন সময়ে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য ভারত মায়ের বীর সন্তানরা মায়ের চরণে শপথ নিতেন। কালক্রমে রাজবাড়ির পুজোর জৌলুস ফিকে হলেও পুরোনো রীতি মেনে এখনও এখানে মা পূজিত হন।”

স্থানীয় এক বাসিন্দা দেবীপ্রসাদ সিংহ দেব জানান, “সারা বছর জীবিকার তাগিদে আমরা যেখানেই থাকি না কেন রাজবাড়ির পুজোয় আমাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত। পুরো গ্রামের মা ও ভাই-বোনেরা খুশি মনে রাজবাড়ির পুজোয় অংশগ্রহণ করেন৷”

কালের নিয়মে কুমারী নদীর তীরে গড়ে ওঠা রাজা খড়গেশ্বর ধবলদেবের রাজপ্রাসাদ মিশেছে মাটিতে। আজও যেটুকু খড়কুটোর মতো পড়ে রয়েছে তা বহন করে চলেছে ইতিহাস। অতীতের সেই রাজকীয় জাঁকজমক ও সশস্ত্র বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলো ইতিহাসের পাতায় স্থান পেলেও অম্বিকানগর রাজবাড়ির দুর্গোৎসবে আজও সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বীর বিপ্লবীদের দেশপ্রেমের আবহ জীবন্ত হয়ে ওঠে।

ADVERTISEMENT