আজকাল ওয়েবডেস্ক: ঢাকের বাদ্যি ক্রমশ স্তিমিত। উৎসবের রেশ কাটতেই চারদিকে বিষাদের সুর। উমাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার টাকির ঐতিহ্যবাহী পুবের বাড়িতে। প্রায় ৩০৭ বছরের প্রাচীন এই রাজবাড়ির দুর্গোৎসবে আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় পূর্বপুরুষদের আমলের রীতিনীতি। পান্তা ভাত ও কচুশাক নিবেদন থেকে সিঁদুর খেলা, মঙ্গলযাত্রা থেকে ২৪ বেয়ারার কাঁধে চড়ে দেবী দুর্গার কৈলাসযাত্রা—প্রতিটি পর্বেই জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, আবেগ ও পারিবারিক পরম্পরা।
পান্তা ভাত-কচুশাক খেয়ে ২৪ বেয়ারার কাঁধে কৈলাসে পাড়ি উমার! টাকি রাজবাড়ির বিসর্জনে বিষাদের সুর
ADVERTISEMENT
টাকির পুবের বাড়ির দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটি পারিবারিক উৎসব নয়, বরং কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্যের জীবন্ত নিদর্শন। সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু, কিন্তু এই পুজোর প্রাচীন রীতিনীতিতে তেমন পরিবর্তন আসেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্যরা আগলে রেখেছেন পূর্বপুরুষদের এই উত্তরাধিকার। পুজোর দিনগুলিতে রাজবাড়ির ঠাকুরদালান ভরে ওঠে দর্শনার্থী ও ভক্তদের সমাগমে।
আরও পড়ুন
পান্তা ভাত ও কচুশাক নিবেদনের বিশেষ রীতি
পুবের বাড়ির বিসর্জন পর্বের অন্যতম আকর্ষণ দেবীকে পান্তা ভাত ও কচুশাক নিবেদন। বাঙালির গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই রীতি দুর্গোৎসবের শেষলগ্নে এনে দেয় এক স্বতন্ত্র মাত্রা। প্রাচীন পারিবারিক প্রথা মেনেই দেবীকে এই নিবেদন করা হয়। এরপর শুরু হয় উমাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি।
এই বাড়ির দুর্গোৎসবের আরও একটি বিশেষ আকর্ষণ ২৪ বেয়ারার কাঁধে দেবীর কৈলাসযাত্রা। দীর্ঘদিনের প্রথা মেনে দেবীকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়ার এই পর্বে আবেগে ভাসেন পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন মহিলারা। চারদিকে আনন্দের রং ছড়িয়ে পড়লেও উমাকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে বিষাদের ছায়া ঘনিয়ে আসে।
দেশভাগের স্মৃতি, আজও অটুট ঐতিহ্য
টাকির পুবের বাড়ির দুর্গোৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অবিভক্ত বাংলার ইতিহাস ও স্মৃতি। দেশভাগের আগে এই রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে মানুষের সমাগম ছিল ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচয়। দেশভাগের পর ভৌগোলিক সীমানা বদলেছে, কিন্তু প্রাচীন এই পুজোর ধারাবাহিকতা আজও বজায় রয়েছে।
ইছামতি নদীর তীরে অবস্থিত টাকি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এক পরিচিত জনপদ। নদীর দুই পারে দুই দেশ থাকলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টান আজও দুই বাংলার মানুষের আবেগকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। সেই সাংস্কৃতিক বন্ধনেরই একটি পরিচিত নিদর্শন টাকির দুর্গোৎসব।
দেবীর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা হয়ে যাবে রাজবাড়ির ঠাকুরদালান। থেমে যাবে ঢাকের বাদ্যি, স্তিমিত হবে উৎসবের আলো। কিন্তু পান্তা ভাত ও কচুশাক নিবেদন থেকে ২৪ বেয়ারার কাঁধে উমার কৈলাসযাত্রা—প্রতিটি রীতির মধ্যেই বেঁচে থাকবে ৩০৭ বছরের ইতিহাস। বিসর্জনের বিষাদ পেরিয়ে পরিবারের সদস্য ও ভক্তদের মনে এখন থেকেই শুরু হবে আগামী বছরের অপেক্ষা। আবার এক বছর পর উমার আগমনে উৎসবের আলোয় ভরে উঠবে প্রাচীন রাজবাড়ি, বাজবে ঢাক, ফিরবে আনন্দের দিন।
ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT
সবাই যা পড়ছেন
ADVERTISEMENT