Loading...

পথের শেষে তিন'শ বছরের ইতিহাস! জেনে নিন সবংয়ের মহাপাত্র বাড়ির পুজোয় যাওয়ার ঠিকানা...

আজকাল ওয়েবডেস্ক: জমিদারির জৌলুস ফিকে হয়েছে বহু দিন। হারিয়ে গিয়েছে অন্দরমহলের বহু সাজসজ্জা, নিভে এসেছে ঝাড়বাতির আলোও। কিন্তু সময়ের কাছে হার মানেনি এক অন্য ঐতিহ্য। পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের বুড়াল অঞ্চলের গুন্ডুত গ্রামে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে পূর্বপুরুষের আমলের মাটির বাড়ি। আর সেই বাড়িতেই প্রায় তিন'শ বছর ধরে শরৎ এলেই ধ্বনিত হয় ঢাকের বাদ্যি, পূজিত হয় দেবী দুর্গা।

এই পুজো শুধু একটি পারিবারিক দুর্গোৎসব নয়, এ যেন এক দীর্ঘ ইতিহাসের উত্তরাধিকার। মহাপাত্র পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কথায়, ১১৩৩ বঙ্গাব্দে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন তৎকালীন জমিদার রামকান্ত মহাপাত্র। সে সময় তিনি সবং অঞ্চলের এক পরিচিত ব্যবসায়ীও ছিলেন। ব্যবসার সূত্রে নিয়মিত কলকাতা যাতায়াত ছিল তাঁর। আর সেই যাতায়াতের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোর জন্মকথা।

ADVERTISEMENT

কেলেঘাই নদীপথে মালপত্র আনা-নেওয়ার জন্য রামকান্তের ছিল দু’টি নৌকা ‘জয়’ ও ‘বিজয়’। পরিবারের দাবি, এক দিন কলকাতা থেকে মালপত্র নিয়ে ফেরার পথে সেই নৌকাতেই রামকান্ত স্বপ্নাদেশ পান। মা কালী নাকি তাঁকে জানান, তিনি তাঁর সঙ্গেই বাড়ি যাচ্ছেন। তবে একটি শর্ত পিছন ফিরে তাকানো যাবে না।

আরও পড়ুন

লোকমুখে শোনা যায়, নৌকা থেকে নেমে বাড়ির পথে হাঁটার সময় রামকান্তের কানে আসে নূপুরের শব্দ। কৌতূহলে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। পিছন ফিরে তাকাতেই দেবীর দর্শন পান। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, তখনই দেবী তাঁকে জানিয়ে দেন, আর মহাপাত্র বাড়ি পর্যন্ত তিনি যাবেন না; কেড়ুর গ্রামেই অবস্থান করবেন। সেই থেকেই কেড়ুর গ্রামের জাগ্রত কালীমন্দিরে দেবী পূজিত হয়ে আসছেন বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।

তবে অলৌকিক কাহিনি সেখানেই থেমে থাকেনি। পরে ফের স্বপ্নাদেশ পান রামকান্ত মহাপাত্র। এ বার নির্দেশ আসে নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করতে হবে। সেই নির্দেশ মেনেই শুরু হয় মহাপাত্র বাড়ির দুর্গোৎসব। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় তিন শতাব্দী। বদলেছে সময়, বদলেছে প্রজন্ম, কালের নিয়মে মুছে গিয়েছে জমিদারির বাহ্যিক চাকচিক্য। তবু থেমে যায়নি পুজো। আজও ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত মহাপাত্র বাড়ি যেন হয়ে ওঠে এক মিলনক্ষেত্র। কর্মসূত্রে বাইরে থাকা পরিবারের সদস্যেরা ফিরে আসেন পূর্বপুরুষের ভিটেয়। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, আশপাশের গ্রামের মানুষ সব মিলিয়ে কয়েক দিনের জন্য পুরনো বাড়িতে যেন আবার ফিরে আসে সেই চেনা প্রাণচাঞ্চল্য।

পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতাও। পূর্বপুরুষদের আমল থেকে চলে আসা নিয়ম মেনে ষষ্ঠীর দিন দুঃস্থদের বস্ত্র বিতরণ করা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। আর বিজয়া দশমীর দিন গোটা গ্রামের মানুষের জন্য আয়োজন করা হয় খিচুড়ি প্রসাদের। ফলে এই পুজো শুধু পারিবারিক আবেগে আবদ্ধ নয়, বরং গ্রামজীবনের সঙ্গেও গভীর ভাবে যুক্ত।

এক সময় এই বাড়িতে জমিদারির প্রতাপ ছিল, আভিজাত্যেরও কমতি ছিল না। ঝাড়বাতির আলোয় আলোকিত হত অন্দরমহল। সেই সময় আজ আর নেই। নেই ‘জয়’ ও ‘বিজয়’ নৌকাও। তবু টিকে রয়েছে বিশ্বাস, রীতি, লোককথা এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতি। বয়সের ভার নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকা মাটির সেই বাড়ি যেন আজও সাক্ষ্য দেয় ঐতিহ্য সব সময় ইট-পাথরের গায়ে নয়, অনেক সময় তা বেঁচে থাকে মানুষের বিশ্বাসে।

কীভাবে পৌঁছবেন মহাপাত্র বাড়ির পুজোয়?

এই পুজোর আকর্ষণ শুধু ইতিহাসে নয়, সেখানে পৌঁছনোর পথেও আছে এক অন্যরকম গ্রামবাংলার টান। কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করলে প্রথমে ট্রেনে এসে নামতে হবে বালিচক রেলস্টেশনে। স্টেশন ছেড়ে রাজ্য সড়ক ধরে এগোতে হবে সবংয়ের দিকে। পথ যত এগোয়, ততই শহুরে কোলাহল পিছনে পড়ে থাকে, সামনে খুলে যায় গ্রামবাংলার চেনা দৃশ্যপট।

সবং পৌঁছে আরও প্রায় আট কিলোমিটার এগোলে বুড়াল বাজার। কিছুটা এগোলে রাস্তার ধারে চোখে পড়বে একটি বড় সরকারি PHE জলট্যাঙ্ক। সেটিই যেন পথের গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। সেই জলট্যাঙ্কের পাশ দিয়েই উত্তরমুখী একটি ঢালাই রাস্তা চলে গিয়েছে গ্রামের দিকে। সেই রাস্তা ধরে এগোতে এগোতে পড়বে গুন্ডুত প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় পেরিয়ে পূর্ব দিকে ঢালাই রাস্তা ধরে আরও প্রায় পাঁচশো মিটার গেলেই সামনে এসে পড়বে মহাপাত্র বাড়ির দুর্গামণ্ডপ।

পথের দু’ধারে গ্রামের নির্জনতা, শরতের আকাশ, কাশফুলের ঋতু আর মাটির গন্ধ সব মিলিয়ে সেখানে পৌঁছনো যেন শুধু একটি পুজোমণ্ডপে যাওয়া নয়, বরং সময়ের স্রোত উজিয়ে কয়েক শতক পুরনো বাংলার এক টুকরো স্মৃতির ভিতরে ঢুকে পড়া।

সবংয়ের গুন্ডুত গ্রামের মহাপাত্র বাড়ির দুর্গাপুজো তাই শুধু চার দিনের আরাধনা নয়। এটি এক পরিবারের ইতিহাস, এক হারিয়ে যাওয়া নদীপথের স্মৃতি, এক অলৌকিক জনশ্রুতি এবং প্রজন্ম পেরিয়ে টিকে থাকা বিশ্বাসের গল্প। সেই কারণেই এই পুজো আজও আলাদা, আজও আকর্ষণের কেন্দ্র।

ADVERTISEMENT