আজকাল ওয়েবডেস্ক: দক্ষিণ কলকাতার যে পুজোগুলি উদ্বোধনের দিন থেকেই দর্শকদের ভিড় টানে, মুদিয়ালি ক্লাব তাদের অন্যতম। ৯৩ বছরের এই পুজোয় প্রতিমাই বরাবর প্রধান আকর্ষণ। প্রতিমা নিয়ে কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, বরং প্রতিমাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় মণ্ডপের পরিকল্পনা। এ বারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। দুর্গাপ্রতিমাকে মাথায় রেখেই মণ্ডপ সাজিয়ে তুলছেন শিল্পী বিমান সাহা। ক্লাবের এ বছরের ভাবনা ‘ঐতিহ্যের লোককথা’।
কলকাতা ও দুর্গাপুজো যেন ইতিহাসের সঙ্গে বয়ে চলা এক নদী। সেই নদীর বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে রয়েছে নানা গল্প, কিংবদন্তি ও লোকবিশ্বাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে ফেরে সেই সব কাহিনি, যা মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় পুরনো কলকাতার বনেদিয়ানা ও পুজোর ঐতিহ্যে। বাঙালির কাছে দুর্গা শুধুই আরাধ্য দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে উমা। তাঁকে ঘিরে আদর, যত্ন ও আপ্যায়নের সেই চেনা আবেগই এ বার মুদিয়ালি ক্লাবের মণ্ডপের মূল সুর।
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে এমনই একটি বহুল প্রচলিত লোকপ্রবাদ রয়েছে, “মা দুর্গা কলকাতায় এলে জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দে-র বাড়িতে সাজেন, কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে ভোগ খান, আর শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাত জেগে নাচ দেখেন।” এই লোককথাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে মুদিয়ালি ক্লাবের মণ্ডপ।
শিল্পী বিমান সাহার কথায়, “ইতিহাসের সঙ্গে মিশেছে কল্পনা, বিশ্বাস ও বাঙালির আবেগ। এই গল্পের কোনও নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নেই। পুরাণ বা ধর্মীয় গ্রন্থেও এর উল্লেখ মেলে না। বরং কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজো এবং দেবীকে আপনজন হিসেবে দেখার বাঙালি মানসিকতাই এই লোকপ্রবাদকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আর সেটাকেই বিভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা হচ্ছে মুদিয়ালি ক্লাবের মণ্ডপ সজ্জায়।”

বাকি মাত্র আর কয়েক দিন। মুদিয়ালি ক্লাবের মণ্ডপে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা শিল্পীদের। নিজস্ব চিত্র।
জোড়াসাঁকোর বনেদি বাড়ি, কুমোরটুলির প্রতিমা নির্মাণের পরম্পরা এবং শোভাবাজার রাজবাড়ির ঐতিহ্য— কলকাতার দুর্গোৎসবের ইতিহাসে প্রতিটি জায়গারই নিজস্ব পরিচয় রয়েছে। লোককথা সেই পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে দেবীর সাজ, ভোগ এবং নাচ-গানের আসরের কল্পনা। দেবী যেন কলকাতায় এসে কোনও অতিথি নন, বরং নিজের বাড়ির মেয়ে। তাঁর সাজগোজ থেকে আপ্যায়ন, সব কিছুতেই পরিবারের মানুষের আন্তরিকতা।
বিমান সাহার ভাবনায় সেই কাহিনিই মণ্ডপের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। এখানে মূল আকর্ষণ প্রতিমা। সেই প্রতিমাকে ঘিরেই তৈরি হবে লোককথার আবহ, যেখানে পুরনো কলকাতার স্মৃতি ও বনেদি বাড়ির পুজোর পরম্পরা মিলেমিশে যাবে।
আসলে দুর্গাপুজোর ইতিহাস কেবল মণ্ডপ, প্রতিমা কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শহরের সামাজিক জীবন, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা নানা কাহিনি। লিখিত ইতিহাসে জায়গা না পেলেও লোকস্মৃতিতে সেই গল্পগুলির অস্তিত্ব আজও অমলিন।
মুদিয়ালি ক্লাবের ‘ঐতিহ্যের লোককথা’ সেই লোকস্মৃতিরই এক শিল্পিত উপস্থাপনা। পুরনো কলকাতার বনেদিয়ানা আর বাঙালির শারদোৎসবের আবেগকে এক সুতোয় বেঁধে এ বারের মণ্ডপ দর্শকদের সামনে তুলে ধরবে পরিচিত এক অনুভূতি— কৈলাস থেকে বাপের বাড়িতে ফেরা উমা যে আজও বাঙালির ঘরের মেয়ে।