Loading...

পোড়া-কালো মুখের প্রতিমা, ৪৪৪ বছর ধরে এভাবেই চলছে ক্যানিংয়ের ভট্টাচার্য পরিবার দুর্গাপুজো

আজকাল ওয়েবডেস্ক: একটি কাক, প্রদীপের সলতে এবং আগুন—এসবের মাধ্যমেই ক্যানিংয়ের একটি দুর্গা প্রতিমার এমন ভিন্ন রূপ পাওয়ার বিষয়টি জড়িয়ে আছে। সাধারণত দুর্গাকে উজ্জ্বল বা সোনালী বর্ণের রূপে দেখা যায়। কিন্তু ক্যানিংয়ের ভট্টাচার্য পরিবারে পুজো করা হয় পোড়া-কালো মুখের দুর্গাকে। পরিবারের মতে, শতাব্দীকাল আগে মন্দিরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই এই প্রথা চালু হয়।

ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্য পীযূষ ভট্টাচার্য বলেন, “এই পূজা ৪৪৪ বছরের পুরনো।”

ADVERTISEMENT

ঢাকার বিক্রমপুরের বালিকলা গ্রামে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। সেখানে দেবী মনসা ও দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে নিবেদিত মন্দির ছিল ওই পরিবারের। পরিবারের সদস্যদের মতে, শুরুতে দুর্গাকে ঐতিহ্যবাহী ‘গৌরবর্ণ’ বা উজ্জ্বল বর্ণের রূপেই পুজো করা হত।

আরও পড়ুন

মন্দির দু'টি পাশাপাশি অবস্থিত ছিল এবং সেগুলোর ছাদ ছিল পাতা দিয়ে তৈরি। একদিন মনসা পুজোর পর পুরোহিত দুর্গা পুজো করতে আসেন। মনসা মন্দিরের দরজা খোলা ছিল, তখন একটি কাক উড়ে ভেতরে ঢোকে, প্রদীপের একটি সলতে তুলে নেয় এবং তা নিয়ে দুর্গা মন্দিরের পাতা-ছাউনি দেওয়া ছাদে গিয়ে বসে। এতে ছাদে আগুন ধরে যায় এবং মন্দিরটি পুড়ে যায়।

পরিবারের পূর্বপুরুষ ও পুরোহিতরা আশঙ্কা করেছিলেন যে, এই ঘটনাটি হয়তো দেবীর অসন্তোষের লক্ষণ, অর্থাৎ তিনি হয়তো আর ভট্টাচার্য পরিবারের থেকে পুজো নিতে চান না। পরিবারের সদস্যরা ধ্যানে বসেন। এরপর পারিবারিক জনশ্রুতি অনুযায়ী, পরিবারের তৎকালীন প্রধান রমাকান্ত ভট্টাচার্য দেবীর কাছ থেকে এক বার্তা পান। দেবী জানান যে, তিনি ভিন্ন এক রূপে পুজো পেতে চান। এক্ষেত্রে তাঁর শরীর হবে ‘বাদামী’ রঙের এবং মুখ হবে পোড়া বা কালো।

পীযূষ ভট্টাচার্য জানান, এভাবেই ‘কালো দুর্গা’ পুজোর প্রথা শুরু হয়।

যদিও মূল পুজোটি ৪৪৪ বছর আগে শুরু হয়েছিল, তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় ৩০০ বছর আগে।

ভট্টাচার্য পরিবারের বাসস্থান বাংলাদেশ এবং ক্যানিং০- উভয় জায়গাতেই ছিল। তাঁরা দুই স্থানের মধ্যে যাতায়াত করতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর, ওই বছরই ঢাকায় শেষবারের মতো এই পুজো হয়েছিল। এরপর পরিবারটি ক্যানিংয়ে চলে আসে এবং সঙ্গে করে নিয়ে আসে ‘কাঠামো’। অর্থাৎ কাঠের সেই কাঠামো যার ওপর প্রতিমাটি তৈরি করা হত সেটিতেই এখনও মায়ের মূর্তি তৈরি হয়। তখন থেকেই ক্যানিংয়ে এই পুজো হয়ে আসছে।

পীযূষ বলেন, “মূল কাঠামোটি ৪৪৪ বছর ধরে একই রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী কেবল এর মেরামত করা হয়েছে।”

এদিকে, পরিবারের মনসা পুজো কোচবিহারে স্থানান্তরিত হয়। পরিবারের সদস্যদের মতে, সেখানকার বেশ কিছু জায়গার নাম (যেমন- মনসা বাজার, মনসা ব্যাঙ্ক এবং মনসা স্টপেজ) এই পুজোর নামানুসারেই রাখা হয়েছে।

বর্তমানে ক্যানিংয়ের দিঘিরপাড়ে ‘বাজার কলকাতা’ আউটলেটের কাছে তাঁদের পারিবারিক বাসভবনে দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়।

পীযূষ জানান, দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতিমাটি নিকটবর্তী একটি মন্দিরে তৈরি করা হয় এবং পারিবারিক বাড়ির কাছেই একটি পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। কাঠামোটি তিন দিন পুকুরের জলে ডোবানো থাকে। এরপর সেটি তুলে আনা হয় এবং পরের বছর আবার ব্যবহারের জন্য রাখা হয়।

আরতি থেকে শুরু করে সন্ধিপুজো- পরিবারটি নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি মেনে চলে। নবমীর দিন পাতা ও কাপড় দিয়ে মানুষের অবয়ব তৈরি করে প্রতীকীভাবে ‘শত্রু’কে বলি দেওয়ার একটি প্রথাও রয়েছে।

জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোটির পুডো করা হয়। মহালয়ার দিন প্রতিমার চোখ আঁকা হয় এবং এরপর প্রতিমা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়।

পীযূষ বলেন, “প্রতিমাটি এখন প্রায় তৈরি। এটি শুকানোর অপেক্ষায় রয়েছে।”

ADVERTISEMENT