আজকাল ওয়েবডেস্ক: শহরের দেওয়ালে, শিল্পের প্রতিটি রেখায়, আর মানুষের স্মৃতিতে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর সৃষ্টির ছাপ। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে যিনি শিল্পকে পৌঁছে দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে, সেই শিল্পী শানু লাহিড়ীকে এবার দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নতুন করে আবিষ্কার করবেন দর্শকরা। পটচিত্র থেকে মাটির কারুকার্য, শিল্পের নানা মাধ্যমের মেলবন্ধনে ভবানীপুরের অবসর সর্বজনীনের মণ্ডপে ফুটে উঠবে এক ব্যতিক্রমী শিল্পীর জীবন ও কর্ম। এবারের থিম অন্য যেখানে অনন্য। বিস্মৃতপ্রায় শিল্পী শানু লাহিড়ীর ব্যক্তিজীবন, শিল্পশৈলী, মিউরাল আর্ট এবং দুর্গাপুজোর আঙিনায় তাঁর অবদানকেই মণ্ডপসজ্জার মধ্য দিয়ে তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
মণ্ডপে কোন কোন শিল্পমাধ্যম কীভাবে ব্যবহৃত হবে, সেই চমক আপাতত দর্শকদের জন্যই তোলা থাক। তবে মণ্ডপে পা রাখলেই যে শিল্পী শানু লাহিড়ীর শিল্পজীবনের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলবে, তা জানিয়েছেন পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা শুভ্রদীপ পাল। শুধুমাত্র মণ্ডপসজ্জায় অভিনবত্ব নয়, এই আয়োজনের লক্ষ্য এক শিল্পীর কাজ ও অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
শানু লাহিড়ী ছিলেন সত্যিই অন্য পথের পথিক। ভবানীপুরের পুলিশ কোয়ার্টারে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে। পরবর্তী সময়ে প্যারিসেও শিল্পশিক্ষার সুযোগ পান তিনি। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় শানু দি। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তার বিস্তার কখনও শ্রেণিকক্ষ কিংবা গ্যালারির চার দেওয়ালে আটকে থাকেনি।
শিল্পকে সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সমসাময়িক শিল্পীদের ছবি সংগ্রহ করে কলকাতার রাস্তায় নিজস্ব উদ্যোগে মুক্ত প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন তিনি। বিশেষভাবে সক্ষম পড়ুয়া, ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ— সকলকে সঙ্গে নিয়ে শহরের বিভিন্ন দেওয়ালকে রাঙিয়ে তুলেছিলেন শানু লাহিড়ী। তাঁর কাছে শিল্প ছিল না কেবল অভিজাত পরিসরের সম্পদ, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ তৈরির এক মাধ্যম।
কলকাতার নাগরিক জীবনে তাঁর সেই কাজের ছাপ আজও রয়ে গিয়েছে। ফিলিপস, মিন্টো পার্ক, শিয়ালদহ-সহ শহরের নানা প্রান্তে তাঁর ওয়াল মিউরালের স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁর তৈরি পরমার মূর্তি আজ আর অস্তিত্বে না থাকলেও, তা রয়ে গিয়েছে শহরবাসীর স্মৃতিতে। সময়ের সঙ্গে অনেক সৃষ্টি হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু শিল্পকর্ম মানুষের মনে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে, সেগুলি দৃশ্যমান না থেকেও বেঁচে থাকে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে শানু লাহিড়ীর সম্পর্কও ছিল গভীর। ১৯৮২ ও ১৯৯৬ সালে ভবানীপুর এলাকার একটি ক্লাবের জন্য নিজেই দুর্গাপ্রতিমা গড়েছিলেন তিনি। পুজোর মণ্ডপ যে শিল্পীর সৃজনশীলতা প্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে উঠতে পারে, সেই সম্ভাবনা তিনি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। দুর্গাপুজোকে ঘিরে শিল্পের নতুন ভাষা তৈরি হওয়ার যে প্রবণতা আজ আরও বিস্তৃত হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর ভাবনাচিন্তা ছিল যথেষ্ট দূরদর্শী।
সেই শিল্পীকে ঘিরেই এবার ভবানীপুরের অবসর সর্বজনীনের নিবেদন। ‘অন্য যেখানে অনন্য’ তাই নিছক একটি পুজোর থিম নয়, বরং এক শিল্পীর জীবন, তাঁর ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের কাছে শিল্পকে পৌঁছে দেওয়ার নিরলস প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি দর্শকরা ফিরে দেখবেন এমন এক শিল্পীকে, যাঁর সৃষ্টির ভাষা ছিল গ্যালারির বাইরেও জীবন্ত, শহরের দেওয়ালে, মানুষের দৈনন্দিনতায় এবং স্মৃতির গভীরে।
উৎসবের আলোয় যখন শহর নতুন করে সেজে উঠবে, তখন অবসর সর্বজনীনের মণ্ডপ হয়ে উঠবে শানু লাহিড়ীকে জানার এক অন্য ঠিকানা। যেখানে শিল্পের সঙ্গে মিলবে ইতিহাস, সৃজনের সঙ্গে মিশবে স্মৃতি, আর দুর্গাপুজোর আনন্দের মধ্যেই ফিরে আসবেন এক বিস্মৃতপ্রায় শিল্পী। সত্যিই, অন্য যেখানে অনন্য।