Loading...

ঢাকের তালে নারী জাগরণ, গ্রাম বাংলা থেকে শহরের রাজপথে এবার মুর্শিদাবাদের রাইহাটের মহিলা ঢাকিরা

আজকাল ওয়েবডেস্ক: পিতৃপক্ষের অবসান, মাতৃপক্ষের সূচনা। শরতের আকাশে এখন পেঁজা তুলোর মতো মেঘের ভেলা, মাঠে মাঠে কাশফুলের দোলা। বাতাসে শিউলির গন্ধ, ভোরের শিশিরে আগমনীর সুর। বছর ঘুরে আবার ঘরে ফিরছেন উমা, সঙ্গে তাঁর ছেলে-মেয়েরা। ঢাকের বোলে, ধুনুচির ধোঁয়ায়, কাঁসরের তালে তালেই তো জেগে ওঠেন মা। আর সেই ঢাকের বোল এবার বাজছে একটু অন্য সুরে, একটু অন্য হাতে। পুরুষের কাঁধ ছেড়ে ঢাক উঠেছে গ্রামের মেয়েদের কাঁধে।

মুর্শিদাবাদের বড়ঞা থানার রাইহাট গ্রাম। চারিদিকে এখনও মাটির গন্ধ, ধানের ক্ষেত, পুকুর পাড়ে বিকেলের আড্ডা। এই গ্রামেরই ঘর সামলে, সন্তান সামলে, সংসারের হাজারো কাজের ফাঁকে একদল মহিলা এখন কাঁধে ঢাক তুলে নিয়েছেন। আর মাত্র দুটো দিন, তারপরেই ষষ্ঠীর বোধন। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে যখন পুরোহিত মন্ত্র পড়বেন, তখন তাদের ঢাকের বোলে জেগে উঠবেন মা।

ADVERTISEMENT

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। কখনও প্রশিক্ষকের উঠোনে, কখনও গ্রামের ফাঁকা মাঠে বসছে মহড়া। পুরুষ ঢাকিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, কোথাও তাদের ছাপিয়ে যাওয়ার এক অদম্য জেদ তাদের চোখে-মুখে।

আরও পড়ুন

এই গল্পের শুরুটা ২০১৭ সালে। রাইহাট গ্রামের বাসিন্দা নিমাই দাস। পেশায় ঢাকি, নিজের একটি পুরুষ ঢাকির দলও আছে তাঁর। বিভিন্ন পুজো, অনুষ্ঠানে বাজাতে যান। সেখানেই একদিন দেখলেন, মঞ্চে মেয়েরা গিটার বাজাচ্ছে, কিবোর্ড বাজাচ্ছে, ড্রাম বাজাচ্ছে। তখনই মাথায় ভাবনাটা খেলে গেল। তিনি বলেন, "অন্যেরা যখন পারছে, আমাদের গ্রামের মেয়েরা কেন পারবে না? তারা কেন শুধু ঘরের চার দেওয়ালেই আটকে থাকবে? তারাও তো দেশ-দুনিয়া দেখতে পারে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।"

শুরুটা হয়েছিল নিজের বাড়ি থেকেই। বাড়ির ও পাশের বাড়ির দু-একজন বউকে নিয়ে। ঢাক তুলে দিয়েছিলেন তাঁদের কাঁধে । প্রথম প্রথম গ্রামের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখেছিল। মেয়েরা ঢাক বাজাবে? এ আবার কেমন কথা? কটূক্তি, হাসি-ঠাট্টা কম শুনতে হয়নি। কিন্তু নিমাই দাস হাল ছাড়েননি। এরপর একজন, দুজন করে বাড়তে লাগল দল। তৈরি হলো - 'রাইহাট সরস্বতী মাতা উন্নয়ন ঢাক সমিতি'।

আজ সেই দলে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ জন মহিলা। কেউ গৃহবধূ, কেউ কলেজ পড়ুয়া, কেউ আবার দুই সন্তানের মা। সংসারের সব কাজ সেরে, দুপুরের বিশ্রামটুকু ভুলে তারা ছুটে আসেন ঢাকের টানে।

দলের সদস্যা কাকলি দাস বলেন, "আমাদের গুরুদেব নিমাই দা হাতে ধরে শিখিয়েছেন। শুধু বাজনা নয়, আত্মবিশ্বাসটাও উনি আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আগে ভাবতাম আমরা পারব না। এখন বুঝেছি, ছেলে আর মেয়ের মধ্যে কোনও তফাৎ নেই। আমরা সবাই সমান। চাই আরও মেয়েরা আমাদের দলে আসুক, শিখুক।"

আর এক সদস্যা রিয়া দাসের গলায় আরও দৃঢ়তা, "মেয়েরা পারে না, এমন কোনও কাজ নেই। সারা পৃথিবীতে মেয়েরা আজ প্লেন চালাচ্ছে, পাহাড়ে চড়ছে। আমরা যদি ঘরে বসে থাকি, তাহলে তো আরও পিছিয়ে পড়ব। যারা একদিন আমাদের নিন্দে করত, আজ তারাই এসে বাহবা দিচ্ছে। এইটাই আমাদের বড় পাওয়া। আমাদের দেখে যদি আর পাঁচটা মেয়ে অনুপ্রাণিত হয়, সেটাই আমাদের জয়।"

প্রশিক্ষক নিমাই দাসের চোখে এখন অন্য স্বপ্ন। তিনি বলেন, "আমার পুরুষ ঢাকির দল নিয়ে তো অনেক জায়গায় গিয়েছি। কিন্তু এই মহিলা দল নিয়ে যে আনন্দ পাই, তা আলাদা। এরা অনেক বেশি নিষ্ঠাবান, অনেক বেশি পরিশ্রমী। রাইহাট থেকে শুরু করে আজ আমরা আশেপাশের অনেক গ্রাম, বহরমপুর, মেদিনীপুর, পুরুলিয়া এমনকি কলকাতাতেও অনুষ্ঠান করে এসেছি। সবাই অবাক হয়ে দেখে, মহিলারা ঢাক বাজাচ্ছে! সম্মানও দেয়।"

তিনি একটা আক্ষেপের কথাও জানালেন। কিছুদিন আগে বিদেশ থেকেও ডাক এসেছিল তাদের অনুষ্ঠানের জন্য। কিন্তু অনেকেরই পাসপোর্ট না থাকায় যাওয়া হয়নি। নিমাই বাবুর ইচ্ছে, আগামী দিনে সবার পাসপোর্ট করিয়ে নিতে পারে তাহলে রাইহাটের এই ঢাকের বোল শুধু বাংলায় নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও বাজবে।

পুজো আসছে। মা দুর্গা আসছেন। তিনি নিজেই তো নারী শক্তির প্রতীক। অসুরদলনী, দশভুজা। সেই শক্তির আরাধনায় যখন পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়া ভেঙে গ্রামের সাধারণ মেয়েরা কাঁধে ঢাক তুলে নেন, তখন তা শুধু একটা বাদ্যযন্ত্রের প্রদর্শনী থাকে না। তা হয়ে ওঠে এক জাগরণের প্রতীক।

ADVERTISEMENT