দুর্গাপুজোর প্রায় শেষলগ্ন৷ নবমীতে আজকাল ডট ইন-এর পাঠকদের জন্য রইল এমন একজন শিল্পীর পুজোর স্মৃতি যিনি ছিলেন নাস্তিক কিন্তু এখন হয়েছেন আস্তিক৷ শিল্প, পরিচিতি, খ্যাতি সবই ছিল তাঁর জীবনে তবুও কেন হঠাৎ গুরুর আশ্রয়ভিক্ষা, কেনই বা বদলে গেল জীবনদর্শন, জেনে নেওয়া যাক সঙ্গীতশিল্পী মেখলা দাশগুপ্তর কাছ থেকে।
মেখলা বলেন, আমি নাস্তিক ছিলাম৷ ছোটবেলা থেকে আমরা সকলেই স্পিরিচুয়াল থাকি৷ বড় হতে হতে বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে আমরা বিচ্যুত হয়ে যাই৷ আমার প্রশ্ন ছিল ছোট থেকেই৷ এটা কেন হয় ওটা কেন হয় এবং প্রকৃতি আমার ভীষণ ভাললাগে৷ বাকি যা হয়েছে সেটা গুরুর কৃপায়৷ আমার গুরুও নাস্তিক ছিলেন এবং গুরুর থেকে যা যা শিক্ষা সংস্কার আমি পেয়েছি সবটাই যুক্তিসম্মত, বিজ্ঞানসম্মত৷ সব বিষয় বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না কিছু বিষয় অনুভব করি৷"
গুরুকৃপা জীবন কতটা বদলেছে? মেখলার বক্তব্য, জীবনে সমস্যা থাকবেই৷ আগে হলে হয়তো কেঁদে মরে যেতাম৷ এখন অনেক ভালভাবে পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব হয়৷ নিজের জীবনকে বার্ড আই ভিউ থেকে দেখলে নিজের থেকে নিজে বিচ্ছিন্ন হয়ে দেখলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়৷ এককথায় বলতে গেকে এটা একদিনের জার্নি নয়৷ ভিতর থেকে পরিবর্তন হয় যেটা বাইরে প্রতিফলিত হয়৷"
সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে ট্রোল করা হয়৷ দ্বিমত আগেও ছিল, এখনও আছে কিন্তু মতানৈক্য হলেই বিশ্রি আক্রমণ কেন করা হয়? এই ট্রোলিং নিয়ে মেখলার মত, ভিতর থেকে অসুখী হলে মানুষ অন্য মানুষকে আঘাত করেন৷ যে নিজে আহত সেই অন্যকে আঘাত করেন৷ আগে আমি অন্যভাবে রিএ্যাক্ট করতাম৷ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারছি৷" কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কথা বলাটা কি খুব প্রয়োজনীয়? মতামত না জানালে তো ট্রোল করার সুযোগ হবে না৷ মেখলার বক্তব্য, সত্যটা কারও পছন্দ হতেও পারে নাও পারে৷ কিন্তু পিপল প্লিজার হতে চাই না৷ আমি রিয়েল থাকতে চাই৷ মা দুর্গার কাছে বর চাইতে হলে মেখলা তাই চাইবেন যেন মানুষের জ্ঞানের দৃষ্টি উন্মুক্ত হয়৷ এবং নিজে চান অদৃশ্য হয়ে হালকা হয়ে যেতে, খিদে তৃষ্ণা থাকবে না৷ শরীরের জন্য খাওয়া ঘুম রোজগার করার তাগিদ৷ এই দায়থেকে মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াতে চান মেখলা৷"
শরৎ মানেই শিউলি ফুল, নীল আকাশা আর পেঁজা তুলোর মতো মেঘ৷ বালুরঘাটে থাকাকালীন শিউলি ফুল ছিল৷ কলকাতায় পাই না৷ তবে আকাশ দেখলেই মনে হয় পুজো এসে গেছে৷
ছোটবেলার পুজো মানে ছিল কয়েকদিনের ছুটি আর পূজাবার্ষিকী পড়া৷ হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা হত পুজোর আগে৷ সেই সময় পুজোবার্ষিকী বাড়িতে এলেও পরীক্ষার আগে পড়তে দিও না বাবা মা, ফলে পুজোর চারদিন পড়তাম৷ আর সেইসময় হিন্দি গানের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল৷ 'তাল'-এর ক্যাসেট কিনেছিলাম টাকা জমিয়ে৷ দাদার কাছ থেকে 'লগান'- এর ক্যাসেট ধার করেছিলাম৷
রিল আসায় কি মানুষের ধৈর্য কমছে? ভাল গান কি মানুষের কাছে পৌঁছছে না? মেখলার মতে, সময় বদলেছে৷ ট্যালেন্ট থাকলেও বহু শিল্পী পরিচিতি পান না। রিয়েলিটি শো-তে আমি না অংশ নিলে এই পরিচিতি হয়তো এত তাড়াতাড়ি আসত না। এখন কাজের পরিসর অনেক বেড়ে গিয়েছে৷ এখন রিয়েলিটি শো-তে যাওয়ারও দরকার নেই৷ প্রতিভা থাকলে তোমার জন্য প্ল্যাটফর্মটা আছে কিন্তু সমস্যাটা হল প্রচুর কন্টেন্ট৷ ফলত প্রমোশন ঠিক করে না হলে কোনও কিছুই মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে না৷ মাথার শান্তি প্রয়োজন। সেই শান্তিটা এখন নেই৷ আগে একটা গান কেমন লাগল সেটা জানার উপায় ছিল না৷ এখন সেই উপায় আছে কিন্তু মানুষ সবসময় খারাপটা নিয়ে কথা বলছেন।
পুজোর স্পেশাল খাওয়াদাওয়ার বিষয় মেখলার সেভাবে কিছু দাবি নেই৷ কারণ মেখলার মায়ের কথায় সে খুব লক্ষ্মী, মেখলা বলেন, "হলেও হয় না হলেও হয়৷ লুচি খেতে ভালবাসি। কিন্তু পুজোতে খেতেই হবে এমনটা নয়৷ নিয়ম করে পুজোতে ভোগ খাওয়া অঞ্জলি এসবও এখন হয় না।"
মেখলা কি চিরকাল ফ্যাশনেবল? "আমার ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল৷ যে কোনও কিছুতে ক্রিয়েটিভিটি আমার ভাল লাগে৷ খাতায় লিখলেও দু'-তিনরকম কালি দিয়ে সাজাতাম৷ সেখান থেকে নিজের সাজগোজের বিষয়টা৷ ফ্যাশনের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় ফিটিংস খুব গুরুত্বপূর্ণ। লুস ফিট হলেও তার একটা ফিট থাকে৷ আরামদায়ক হতে হবে৷ অনুষ্ঠানে আমি একটু রঙচঙে পোশাক পরতে পছন্দ করি৷ তবে প্যাস্টেলও পরি। নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই৷ অনলাইন থেকে প্রচুর শপিং করি৷
রিয়েলিটি শো থেকে এলেও মেখলা একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে পেরেছেন৷ এই পথটা কেমন ছিল? আজকাল ডট ইন-এর প্রশ্নে মেখলা বলেন," আমি চিরকাল শিল্পী হতে চেয়েছি৷ আমি গান গেয়ে যা রোজগার করি সবটাই সৃষ্টিশীল কাজে খরচ করি৷ নিজের গান পডকাস্ট ইত্যাদি করি। বাকি বিষয় আমি কিপ্টে শুধু গানের বিষয় বা কোনও সৃষ্টিশীল কাজে আমি খরুচে৷ কারণ একটা গান হোক বা যে কোনও সৃজনশীল কাজ নিজে উদ্যোগ নিয়ে টাকা খরচ করে করাটা অনেকেই করেন না৷ এইসব কাজে আর্থিক খরচ হয় কিন্তু অনেকসময় সেই পরিমাণ রিটার্ন আসে না৷ প্রচুর করতে পারি না তবে চেষ্টা করি৷"
'মন কেমনের জন্মদিন' এতটা জনপ্রিয় হবে আগে কি কখনও ভেবেছিলেন? মেখলার বক্তব্য, "এই গানটা আমার অ্যালবামের গান ছিল৷ কোভিডের জন্য অডিও রিলিজ করতে পারিনি৷ গানটা রেকর্ড হওয়ার পরে রণজয়দা সম্ভবত পরিচালকদের শুনিয়েছিলেন৷ পরিচালকদের পছন্দ হয় তখন সিনেমায় ব্যবহারের জন্য আমাকে বলা হয়৷ আমি চেয়েছিলাম গানটা যেন আমার থাকে৷ পরে সিনেমায় গানটা রিলিজ করল৷ মানুষজন ভালবাসলেন।