Loading...

বছরভর শিলাখণ্ড, দশমীতে দুর্গা! জঙ্গলমহলের মা গুপ্তমণির পুজো ঘিরে আশ্চর্য লোককথা

আজকাল ওয়েবডেস্ক: নেই মাটির তৈরি সাবেকি প্রতিমা। দেবীর আদি অধিষ্ঠান একটি শিলাখণ্ডে! বছরের প্রতিটি দিন সেই শিলাখণ্ডকে ঘিরেই চলে পুজো-অর্চনা। কিন্তু দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমীতে বদলে যায় আরাধনার রীতি। সে দিন শিলাখণ্ডরূপী দেবী গুপ্তমণিই পূজিত হন দুর্গারূপে। আর এই ব্যতিক্রমী উপাসনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজার হারিয়ে যাওয়া হাতি, এক শবর দম্পতির স্বপ্নাদেশ এবং কয়েকশো বছরের পুরনো এক আশ্চর্য জনশ্রুতি।

ঝাড়গ্রামের জঙ্গলমহলে শাল-পিয়ালের ছায়ায় আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছেন মা গুপ্তমণি। ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সংযোগবর্তী শুকনিবাসা মৌজায়, কলকাতা–মুম্বই ছয় নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে তাঁর মন্দির। দেবীর নাম থেকেই পরিচিতি পেয়েছে সংলগ্ন এলাকা। স্থানীয় মানুষের কাছে গুপ্তমণি আবার ‘বনদুর্গা’ নামেও পরিচিত।

ADVERTISEMENT

কিন্তু জঙ্গলের মাঝে একটি শিলাখণ্ড কী ভাবে হয়ে উঠল দেবীর অধিষ্ঠান? উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হয় ঝাড়গ্রামের মল্লদেব রাজাদের আমলে। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, এক সময় রাজার অত্যন্ত প্রিয় ও প্রশিক্ষিত একটি হাতি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সৈন্য পাঠিয়েও তার সন্ধান মেলেনি। দুশ্চিন্তায় পড়েন রাজা। কথিত আছে, এর পর এক রাতে রাজা স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে জানতে পারেন, শুকনিবাসা মৌজার গভীর জঙ্গলে লতাপাতার মধ্যে আটকে রয়েছে তাঁর হারিয়ে যাওয়া হাতি। অন্যদিকে, ওই এলাকার এক শবর দম্পতিও নাকি একই সময়ে স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। তাঁদের জানানো হয়, জঙ্গলের এক গুপ্ত স্থানে শিলাখণ্ডরূপে অধিষ্ঠান করছেন দেবী। তিনি ওই দম্পতির হাতেই পুজো পেতে চান। সেই বিশ্বাসে জঙ্গলে গিয়ে শিলাখণ্ডটির সন্ধান পান শবর দম্পতি। শুরু করেন আরাধনা। জনশ্রুতি, হাতির খোঁজ করতে করতে রাজাও সেখানে পৌঁছে যান। ফিরে পান তাঁর হারিয়ে যাওয়া প্রিয় হাতিটিকে। দেবীর মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে শিলাখণ্ডরূপী দেবীর নাম রাখেন ‘গুপ্তমণি’।

আরও পড়ুন

স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, দেবীর পুজোর জন্য শুকনিবাসা মৌজায় জমি দান করেছিলেন তৎকালীন ঝাড়গ্রামের রাজা। শবর সম্প্রদায়ের বসবাসের জন্যও জমি দেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে। সেই থেকেই দেবীর আরাধনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যায় শবর সমাজ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও পুজোর সেই দায়িত্ব অন্য কারও হাতে যায়নি। প্রথম যে শবর দম্পতি দেবীর আরাধনা শুরু করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, তাঁদের বংশধররাই আজও পুজোর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমান পুরোহিত দীপু ভুক্তা সেই পরিবারেরই উত্তরসূরি।

বিজয়া দশমীতেই কেন দুর্গারূপে পুজো? মা গুপ্তমণির আরাধনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রয়েছে বিজয়া দশমীর আচার-অনুষ্ঠানে। সারা বছর শিলাখণ্ডরূপেই পূজিত হন দেবী। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতেও বজায় থাকে সেই প্রাচীন উপাসনার রীতি। তবে দশমীর দিন দেবীকে দুর্গারূপে আরাধনা করা হয়। ওই দিন পুকুর থেকে জল এনে মন্দিরে ঘট স্থাপন করা হয়। তার পর বিশেষ পুজোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দশমীর আরাধনা। দিনভর পুজো-অর্চনার পর সন্ধ্যায় হয় আরতি। শেষে ঘট বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় বিশেষ পুজো।

এখানে দুর্গাপুজোর প্রচলিত প্রতিমা বিসর্জনের পরিবর্তে ঘট বিসর্জনের এই প্রথাই মন্দিরের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য।

মন্দির নতুন, কিন্তু সরেনি দেবীর আদি আসন!

সময়ের সঙ্গে বদল এসেছে মন্দিরের পরিকাঠামোয়। পুরনো মন্দিরের পরিবর্তে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন মন্দির। রাজস্থান থেকে আনা হয়েছে দশভূজা দুর্গার মূর্তিও। কিন্তু এত পরিবর্তনের মধ্যেও দেবীর আদি শিলাখণ্ডের স্থান বদল করা হয়নি। স্থানীয় বিশ্বাসকে মর্যাদা দিয়েই অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে প্রাচীন অধিষ্ঠান। ফলে নতুন মন্দিরের মধ্যেও আজও জীবন্ত রয়েছে কয়েকশো বছরের পুরনো উপাসনার ধারা। মা গুপ্তমণিকে ঘিরে রয়েছে আরও এক বিশেষ লোকবিশ্বাস। কথিত আছে, হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরে পাওয়ার আশায় দেবীর কাছে মানত করলে মনস্কামনা পূরণ হয়। সেই বিশ্বাসেই বহু মানুষ পুজো দিতে আসেন মন্দিরে। ফুল, ফল, বেলপাতা ও প্রসাদ নিয়ে দেবীর আরাধনায় শামিল হন ভক্তেরা। বিশেষ করে মঙ্গল ও শনিবারে মন্দিরে ভিড় বাড়ে। দুর্গাপুজোর সময়ও দূরদূরান্ত থেকে আসেন অসংখ্য দর্শনার্থী।

তবে মা গুপ্তমণির মন্দিরের গুরুত্ব কেবল পুজো-অর্চনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জঙ্গলমহলের লোকসংস্কৃতি, প্রকৃতিনির্ভর উপাসনা, শবর সম্প্রদায়ের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং রাজপরিবারকে ঘিরে প্রচলিত জনশ্রুতি সব মিলিয়ে এই মন্দির এক স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। যুগ পাল্টেছে। বদলেছে মন্দিরের চেহারা। বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। কিন্তু বদলায়নি দেবীর আদি অধিষ্ঠান, বদলায়নি শবর পরিবারের হাতে পুজোর পরম্পরা। তাই জঙ্গলমহলের মা গুপ্তমণি শুধুই এক আরাধ্যা দেবী নন, তিনি শতাব্দী পেরিয়ে বেঁচে থাকা লোকবিশ্বাস, ইতিহাসের স্মৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক।

ADVERTISEMENT