আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলার সেরা উৎসব দুর্গাপুজো দরজায় কড়া নাড়ছে। সেই আবহেই পূর্ব বর্ধমানের রায়ান গ্রামের চৌধুরী বাড়ির দালানে এসে পৌঁছেছে একচালার সাবেকি প্রতিমা। দেখতে দেখতে তিনশো ষাট বছরে পা দিল এই পুজো। যে সময়ে দিল্লিতে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসন চলছিল, সেই আমলেই শুরু হয়েছিল এই পারিবারিক পুজোর।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরী বাড়ির দরদালানের এই পুজো আজ আর শুধুই এক পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, হয়ে উঠেছে গোটা রায়ান গ্রামের প্রাণের উৎসব।
ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী এই চৌধুরী বাড়ি। অতীতে এই বাড়িতে পা রেখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, মহাশ্বেতা দেবী ও ভোলানাথ সেনের মতো দিকপাল ব্যক্তিত্বরা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। সাবেকি রীতি মেনে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পুজোর প্রাক পর্ব।
চৌধুরী বাড়ির প্রবীণ সদস্য বিশ্বেশ্বর চৌধুরী জানান, রথের দিন দেবীর কাঠামো পুজোর মাধ্যমে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। এরপর মহালয়ার দিন চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে দেবী পান পূর্ণ রূপ।
বৈদিক প্রথা এবং গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার নিয়ম মেনে পঞ্চমীর দিন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় পুজো। দশমীতে দেবী প্রতিমা বিসর্জনের পর সেই বেদীতেই প্রতিস্থাপিত হন মা লক্ষ্মী। পঞ্চমীর দিন চৌধুরী বাড়িতে যে জোড়া প্রদীপ প্র জ্বালানো হয়, তা একটানা জ্বলতে থাকে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত। ফলে উৎসবের রেশ বজায় থাকে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্তই।
বহু বছর আগে পশুবলি প্রথা বন্ধ হলেও নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যে এতটুকুও ঘাটতি পড়েনি। পূর্বপুরুষদের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মেনেই এখনও পুজোর সমস্ত আচার ও ব্যয়ভার বহন করা হয়। পুজোর খরচ মেটাতে পরিবারের একটি নির্দিষ্ট দিঘির মাছ বিক্রির আয় কাজে লাগানো হয়। নবমীর দিন গ্রামের বহু মানুষ এই চৌধুরী বাড়িতে প্রসাদ গ্রহণ করেন।
সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই পুজো। তৎকালীন জমিদারি আমল থেকেই পুজোর পুরোহিত, নাপিত ও তাঁতিদের নিষ্কর জমি দেওয়া হয়েছিল, যা তাঁরা আজও ভোগ করে আসছেন। ফলে বংশপরম্পরায় তাঁরাও এই পুজোর সমান শরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্য তথা চিকিৎসক বিবস্বান চৌধুরী জানান, কর্মসূত্রে এখন পরিবারের অনেকেই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। কিন্তু পুজোর ক'টা দিন সবাই আবার শিকড়ের টানে এক ছাদের তলায় ফিরে আসেন। বস্ত্রদান থেকে শুরু করে গ্রামের মানুষকে নিয়ে আনন্দ উদযাপন- সব মিলিয়ে রায়ানের চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো আজও তার সাবেকি গৌরব ও মিলনের বার্তা বহন করে চলেছে।