Loading...

সূর্যের আলোয় জ্বলে হোমের আগুন! কেশিয়াড়ির দত্ত বাড়িতে আড়াইশো বছর ধরে পটেই আরাধ্যা দুর্গা

আজকাল ওয়েবডেস্ক: জমিদারি গিয়েছে বহু আগেই। হারিয়েছে মাসভর যাত্রার আসরও। চুন-সুরকি আর ঝামা ইটের পুরনো বাড়ির অনেকটাই এখন বদলে গিয়েছে পাকা নির্মাণে। কিন্তু বদলায়নি পুজোর রীতি। প্রায় আড়াইশো বছর ধরে কেশিয়াড়ির হাশিমপুর গ্রামের দত্তবাড়িতে মাটির প্রতিমা নয়, পটের দুর্গাই পূজিতা হয়। আজও সপ্তমীর ঘটোত্তোলনে বের করা হয় জমিদারি আমলের তরোয়াল। হোমের আগুন জ্বলে সূর্যের আলো থেকে।

কেশিয়াড়ির আমতলা বাসস্টপেজ থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ৪০০ মিটার মোরাম রাস্তা পেরোলেই দত্ত পরিবারের পুরনো বাড়ি। চারপাশে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও পুরনো চুন-সুরকির দেওয়াল, কোথাও ভগ্ন স্থাপত্যের স্মৃতি। পরিবারের সদস্যেরা নিজেদের উদ্যোগে প্রাচীন মন্দিরের সংস্কার করিয়েছেন। তবে পুরনো দিনের বহু চিহ্ন এখনও রয়ে গিয়েছে বাড়ির আনাচেকানাচে।

ADVERTISEMENT

পরিবারের বয়ান অনুযায়ী, বর্ধমান থেকে সাধুচরণ দত্ত এসে হাশিমপুরে বসতি গড়েছিলেন। তাঁর একমাত্র পুত্র গোকুলচরণ দত্ত ছিলেন কৃষিজীবী। গোকুলচরণের দুই ছেলের মধ্যে বড় হরণারায়ণ দত্ত ব্রিটিশ আমলে ইংরেজদের উকিল ছিলেন। তাঁর সময়েই পরিবারের জমিদারির বিস্তার ঘটে এবং শুরু হয় দুর্গাপুজো। সেই পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্য পটের প্রতিমা। মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ে নয়, আঁকা পটেই দেবীর আরাধনা হয় এখানে। প্রায় ২৫০ বছর ধরে সেই রীতিই বহন করে চলেছে দত্ত পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম। গোস্বামী মতে হয় পুজো।

আরও পড়ুন

সপ্তমীর দিন ঘট আনতে যাওয়ার সময় সামনে আসে পরিবারের সংরক্ষিত প্রাচীন তরোয়াল। যে সদস্য পুজোয় ব্রতী থাকেন, একমাত্র তিনিই সেই তরোয়াল হাতে নিতে পারেন। ঘট বিসর্জনের সময়ও বের করা হয় সেটি। পরিবারের প্রচলিত বিশ্বাস, দেবীর আগমন ও গমনের পথে যাতে কোনও বাধা না আসে, অশুভ শক্তি যাতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। সেই ভাবনা থেকেই এই তরোয়াল বহনের রীতি।

শুধু তরোয়াল নয়, হোমের আচারেও রয়েছে প্রাচীনত্বের ছাপ। সূর্যের রশ্মি আতস কাচের সাহায্যে কেন্দ্রীভূত করে আগুন জ্বালানো হয়। সেই আগুনেই শুরু হয় হোম। পরিবারের দাবি, পুরুষানুক্রমে এই নিয়ম চলে আসছে। পুজোয় বলির রীতিও রয়েছে। তবে পশুবলি নয়। মসুর ডাল, গোটা মুগ-সহ বিভিন্ন শস্য দিয়ে হয় ‘রিপু বলিদান’। পরিবারের সদস্যদের মতে, মানুষের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তির প্রতীকী বিনাশের ভাবনাই এর সঙ্গে যুক্ত।

দত্ত পরিবারের কুলদেবতা দামোদর জিউ। শালগ্রাম শিলা রূপে তিনি আজও নিয়মিত পূজিত হন। প্রতিদিন অন্নভোগ নিবেদনের রীতিও চালু রয়েছে।একসময় দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে এই জমিদারবাড়িতে চলত প্রায় এক মাসের যাত্রাপালা। উৎসবে ভিড় জমাতেন আশপাশের বহু গ্রামের মানুষ। জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়েছে সেই আয়োজন। পরিবারের অনেক সদস্যও এখন কর্মসূত্রে ছড়িয়ে রয়েছেন বিভিন্ন জায়গায়। কেউ প্রয়াত হয়েছেন, কেউ আর গ্রামে থাকেন না। তবু পুজো বন্ধ হয়নি।

আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রাচীন রীতি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন বর্তমান উত্তরসূরিরা। পরিবারের সদস্যদের আবেদন, জেলার এমন ঐতিহ্যবাহী বনেদি বাড়ির পুজো ও পুরনো স্থাপত্য সংরক্ষণে সরকার সাহায্যের হাত বাড়াক। জমিদারির জৌলুস আজ ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু পটের দুর্গা, আতস কাচের আগুন আর হাতে ধরা সেই পুরনো তরোয়াল সব মিলিয়ে কেশিয়াড়ির হাশিমপুরে দত্তবাড়ির পুজোয় আজও বেঁচে রয়েছে আড়াইশো বছরের এক টুকরো অতীত।

ADVERTISEMENT