Loading...

অলৌকিকতা আর বিশ্বাসের ৬০০ বছর, প্রতিপদে শুরু পুজো, ব্যানার্জি বাড়ির 'জাগ্রত দুর্গা' দেখতে ভিড়ে জমে সুতির আট পলগাছিতে

আজকাল ওয়েবডেস্ক: অলৌকিকতা এবং বিশ্বাসের মেলবন্ধনে আজও পূজিতা হয় দুর্গা। মুর্শিদাবাদের সুতি থানার অন্তর্গত আট পলগাছি গ্রামের ব্যানার্জি বাড়ির দুর্গাপুজো শুধু একটি পুজো নয়, এটি ৬০০ বছরের এক ইতিহাস, এক মহোৎসব। এই পুজোকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকা জুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ব্যানার্জি বাড়ির দুর্গা মায়ের মাহাত্ম্য এতটাই যে, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন শুধু একবার প্রতিমা দর্শনের টানে। কেউ আবার মনস্কামনা পূরণের জন্য মানত করেন।

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, শাক্ত মতে কাশীনাথ সরকারের হাত ধরেই প্রথম শুরু হয়েছিল এই পুজো। প্রাচীন রীতিনীতি মেনে আজও এখানে ছাগ বলির প্রচলন রয়েছে। অন্যান্য বাড়ির পুজো যখন ষষ্ঠী থেকে শুরু হয়, তখন এই বাড়ির পুজো শুরু হয় প্রতিপদ থেকেই। মায়ের ভোগেও রয়েছে বিশেষত্ব। অন্ন ভোগের পাশাপাশি মাকে দেওয়া হয় মাছের ভোগ।

ADVERTISEMENT

এই পুজোর সূচনা নিয়ে এক অলৌকিক লোকশ্রুতি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। শোনা যায়, ব্যানার্জি পরিবারের কোনও এক পূর্বপুরুষ স্বপ্নে দেখেন সুতির আট পলগাছি গ্রামের পাশের একটি বিলে দুর্গা জলে ভেসে আসছে এবং ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সকলে ‘মা, মা’ বলে ডাকছেন। এই ঘটনার পরের দিনই সত্যিই ওই বিলের জলে একটি জবা ফুল এবং মুখ-বাঁধা একটি মাটির হাঁড়ি ভেসে উঠতে দেখা যায়। ব্যানার্জি পরিবারের সদস্যরা সেই হাঁড়ি এবং জবা ফুল অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং মাটিতে পুঁতে প্রতিমার বেদী স্থাপন করেন। তখন থেকেই শুরু হয় মা দুর্গার আরাধনা।

আরও পড়ুন

এই বংশের সপ্তম প্রজন্মের সদস্য শিবশঙ্কর ব্যানার্জি ইংরেজদের দেওয়া 'সরকার' পদবী ত্যাগ করে ব্যানার্জি পদবী গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে তাঁর ছেলে সুখেন ব্যানার্জি এই পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন। সুখেন ব্যানার্জি বলেন, 'আমাদের বাড়ির দুর্গা খুবই জাগ্রত। প্রাচীন রীতিনীতি মেনে আজও আমরা দুর্গার পুজো করি। রথের দিন কাঠামোয় মাটি দেওয়া হয়। তারপর প্রতিপদ থেকে আমাদের বাড়ির পুজো শুরু হয়। সপ্তমীতে ঘট ভরে নবপত্রিকাকে বরণ করা হয়।' তিনি আরও বলেন, 'আমাদের পুজোয় প্রতিপদ, সপ্তমী, অষ্টমীর সন্ধিপুজো এবং নবমী, এই চার দিনই ছাগ বলির প্রথা রয়েছে।'

তবে এই পুজোর সবচেয়ে অলৌকিক এবং রোমহর্ষক মুহূর্ত হল সন্ধিপুজো। সুখেন ওই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে বলেন, 'সন্ধিপুজোয় আমাদের একটি বিশেষ রীতি আছে। আমরা পরিবারের সবাই মিলে ‘মা,মা’ বলে চিৎকার করি এবং জোরে জোরে কাঁসর-ঘণ্টা বাজাতে থাকি। আর অলৌকিকভাবে তখনই দুর্গা প্রতিমার চরণ থেকে একটি ফুল খসে পড়ে। তখনই আমরা বুঝতে পারি সন্ধিপুজোর সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। এই দৃশ্য দেখতে বহু মানুষ ভিড় করেন।'

শুধু ব্যানার্জি পরিবারের কাছেই নয়, গোটা সুতি এলাকার মানুষের কাছেও আট পলগাছির এই পুজো অত্যন্ত পরিচিত এবং আবেগের। ৬০০ বছরের প্রাচীন এই পুজো আজও তার সমস্ত রাজকীয় এবং অলৌকিক ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে। ইট-কাঠের আধুনিকতার মাঝেও ব্যানার্জি বাড়ির এই পুজো প্রমাণ করে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।

ADVERTISEMENT