Loading...

নবাব আলিবর্দী খাঁ দিয়েছিলেন ১৬০টি গ্রাম! মুর্শিদাবাদের ২৫০ বছরের ঐতিহ্য, আজও রহস্য ‘মা বুড়ি’র পুজোয়

আজকাল ওয়েবডেস্ক: দুর্গাপুজো মানেই উমার ঘরে ফেরা। ষষ্ঠীর বোধনে কৈলাস থেকে মর্ত্যে নেমে আসেন দশভূজা মা, সঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতী-গণেশ-কার্তিক। তবে একই মণ্ডপে তিনটি চতুর্ভূজা দুর্গাপ্রতিমা, প্রায় ২৫০ বছর ধরে এই ব্যতিক্রমী রীতিই মুর্শিদাবাদের পাশলা গ্রামের এই পুজোকে আর পাঁচটা বনেদি বাড়ির পুজো থেকে আলাদা করে রেখেছে।

নবগ্রাম থানার পাশলা গ্রামের রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো শুধুমাত্র একটি সাধারণ দুর্গাপুজোই নয়, এর পিছনে রয়েছে এক রহস্যেমোড়া ইতিহাস। যা আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষকে এই পুজোর প্রতি আজও আকৃষ্ট করে। স্থানীয়ভাবে ‘মা বুড়ি’র পুজো নামে পরিচিত এই পুজোর বিশেষত্ব হল একই মণ্ডপে তিনটি পৃথক দুর্গাপ্রতিমার আরাধনা হয় এবং এখানে মা হলেন চতুর্ভূজা। বোধনের সকাল থেকেই সেই পুজো দেখতে ভিড় জমান দর্শনার্থীরা।

ADVERTISEMENT

পরিবারের সদস্য কুনাল রায়চৌধুরী জানালেন, “ষষ্ঠীর সকালে স্থানীয় পুকুরে পুজোর ঘট ভরার মধ্যে দিয়ে আমাদের পুজোর সূচনা হয়। ষষ্ঠীতে দেবীর উদ্দেশ্যে দেওয়া হয় ছাগবলি। তবে শুধু ষষ্ঠী নয়, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পর্যন্ত চলে এই বলিদান প্রথা। কারণ আমাদের পুজো হচ্ছে শাক্ত মতে।”

আরও পড়ুন

পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, নবাবী আমলে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন শশীকান্ত রায়। পরে তাঁর কাকার দুই ছেলে কৃষ্ণচন্দ্র এবং গিরি রায়চৌধুরী, গ্রামবাসীদের মনোরঞ্জনের জন্য শশীকান্তের পুজোর পাশেই নিজেদের দু’টি আলাদা দুর্গাপুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনটি পুজোই একই মণ্ডপে একসঙ্গে হতে থাকে।

এই পুজোর পিছনে রয়েছে এক লোককথা। রায়চৌধুরী পরিবারের দাবি, প্রায় ২৫০ বছর আগে দহপাড়ার বাসিন্দা শশীকান্ত রায় ছিলেন মা কালীর সাধক। কামাখ্যায় সাধনা করতে গিয়ে তাঁর আলাপ হয় তন্ত্রসাধিকা কুণ্ডলা মায়ের সঙ্গে। আলাপ গভীর হয়, পরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী কুণ্ডলা মাকে নিয়ে গ্রামে ফেরার পথে গঙ্গার পাড়ে একটি পাথরের দুর্গামূর্তি কুড়িয়ে পান শশীকান্ত। এরপরই স্বপ্নাদেশ পান, যাত্রার তৃতীয় দিনে যেখানে পৌঁছবেন, সেখানেই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্ত্রী কুণ্ডলাকে নিয়ে রওনা দেওয়ার তৃতীয় দিন পাশলা গ্রামে গম্ভীরা নদীর পাড়ে এসে মূর্তিটি এত ভারী হয়ে যায় যে আর বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়নি। তখন থেকেই শুরু হয় এই পুজো।

তবে এখানেই শেষ নয়। এই পুজোর কথা জানতে পেরে নবাব আলিবর্দী খাঁ শশীকান্তকে ১৬০টি গ্রাম উপহার দেন এবং সেই গ্রামগুলির করের টাকায় পুজো চালানোর নির্দেশ দেন। সেই থেকেই ওই অঞ্চলের জমিদার হয়ে ওঠেন শশীকান্ত এবং গড়ে তোলেন বিশাল দুর্গা মন্দির। যদিও পরবর্তীকালে ‘রায়চৌধুরী’ উপাধি লাভ করেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। আজও এখানে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে, তিনজন পুরোহিত একসঙ্গে তিনটি মূর্তির পুজো করেন। কিন্তু হোম হয় একটি। আর এখানে মা দুর্গাকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। তার পরিবর্তে লুচি ভোগের আয়োজন করা হয় ।

পরিবারের সদস্য নিখিল রায়চৌধুরী জানিয়েছেন, “ষষ্ঠীর ভোরে পরিবারের সদস্যরা নিকটবর্তী দীঘিতে কলসিতে জল ভরতে যায়। প্রথমে ‘মা বুড়ি’র জন্য জল নেওয়া হয়, তারপর বাকি দু’টি প্রতিমার জন্য।”

এই পুজোকে ঘিরে গোটা পাশলা গ্রাম জুড়ে বসে বিশাল মেলা। দশমীতে বেহারারা কাঁধে করে তিনটি প্রতিমাকে নিয়ে যান ডিহি দীঘির ঘাটে। প্রথমে ‘মা বুড়ি’র নিরঞ্জন হয়, তারপর একে একে বাকি দু’টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় ডিহি দীঘির জলে। বনেদিয়ানা আর ভক্তির এই মেলবন্ধনই প্রতি বছর পাশলাকে মুর্শিদাবাদের পুজো মানচিত্রে আলাদা জায়গা করে দেয়।

ADVERTISEMENT