আজকাল ওয়েবডেস্ক: কৈলাস থেকে এখানে দেবী আসেন রাজবংশী বধূর সাজে। ঐতিহ্য পরম্পরা বহমান তিস্তাপাড়ের বসুনিয়া বাড়ি ‘দেবী ঠাকুরানি’ পুজোতে।
পরিবারের কচিকাঁচা থেকে স্থানীয় বাচ্চারা জন্মাষ্টমীর পরের দিন মায়ের মন্দিরের সামনে দধি কাঁদো খেলায় লিপ্ত হন। আর সেদিন থেকেই এই মাটির ছোঁয়া দিয়ে মায়ের মূর্তি তৈরির কাজ শুরু হয়।
ADVERTISEMENT
কালের নিয়মে যোগের তালে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার জগতে ঐতিহ্য বাঁচানোর লড়াই চলছে বসুনিয়া পরিবারে। প্রতি বছরের মতোই ঐতিহ্য ধরে রেখে দেবী বরণের আয়োজন চলছে উত্তরবঙ্গের তিস্তা পাড়ের বসুনিয়া বাড়িতে।
দেবীর মুখের আদলে মঙ্গোলীয় জনজাতির ছোঁয়া ধরে রাখার ব্যাপারে সচেতন পরিবারের সদস্যরা। জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির আমগুড়ি বাজার সংলগ্ন এলাকায় বসুনিয়া পরিবারের এই পুজো ২১৫ বছরের পুরনো বলে পরিবারের দাবি।
সমগ্র উত্তর বঙ্গে রাজবংশী সমাজে মা দুর্গা পরিচিত ‘দেবী ঠাকুরানি’ নামে। কলেবরে আধুনিক হয়ে উঠলেও ঐতিহ্যে অমলিন বসুনিয়া পরিবারেও তাঁর পরিচিতি এই নামেই। নামকরণের পাশাপাশি তফাৎ রয়েছে দেবীর গড়ন এবং সাজেও।
দেবী ঠাকুরানির বর্ণ রক্তিম। পরণে থাকে সাধারণ তাঁতের শাড়ি। সেটা গোড়ালির উপর পর্যন্ত। ঠিক যেমনটা দেখা যায় তিস্তা পাড়ের গাঁয়ের বধূদের সাজে। পরিবারের সদস্য অনিল বসুনিয়া বলেন, ‘আমাদের দেবী আরাধনার ইতিহাস ডুয়ার্সে সবচেয়ে প্রাচীন। ১৮১০ সালে জোতদার ধনবর বসুনিয়া এই পুজোর সূচনা করেন। ওই সময় জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। কোনও কারণে কোচবিহার রাজ্য থেকে বিতারণের পরে ধনবর তৎকালীন চাপগড় পরগনার শ্বাপদ সঙ্কুল আমগুড়ি গ্রামে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন।’
পরিবারের কর্তা পেশায় শিক্ষক সুনীল বসুনিয়া বলেন, ‘ধনবর কোচবিহার রাজপরিবারের পুজো দেখেছেন। হয়তো সে কারণেই রাজবাড়ির দেবীর গায়ের রংয়ের ছাপ রেখেছিলেন নিজের বাড়ির প্রতিমার ক্ষেত্রেও। তবে বধূর আদলে দেবী ঠাকুরানির গড়ন ঠিক করেছিলেন নিজেই।’
জানা যায়, শুরুর দিকে এই পুজো ‘যাত্রা পুজো’ নামে কিরাত ভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিচিত হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে তা পাল্টে হয় দেবী ঠাকুরানির আরাধনা। বর্তমানে রাজবংশী সমাজের নতুন প্রজন্ম অবশ্য দেবী ঠাকুরানিকে দেবী দুর্গা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।
প্রাচীন নথি ঘেঁটে বসুনিয়া পরিবারের সদস্যরা জানান, পুজোর শুরুটা খুব একটা সহজ ছিল না। ওই সময় চাপগড় অথবা আমগুড়ি এলাকায় মৃৎ শিল্পী, পুরোহিত এবং ঢাকি পাওয়া যেত না। জলপাইগুড়ি তখনও জঙ্গলে ভরা।
ধনবর বসুনিয়া পুজো শুরু করার ৫৯ বছর পরে ১৮৬৯ সালের ১ জানুয়ারি জেলা সদরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সে কারণে বসুনিয়া পরিবারকে প্রথমদিকে কয়েক বছর অধুনা বাংলাদেশের রংপুর থেকে ঘোড়ার গাড়িতে প্রতিমা আনতে হত।
পরবর্তী কালে ধনবরের ছেলে মুসব্বর বসুনিয়া এক মৃৎ শিল্পী পরিবারকে রংপুর থেকে এনে নিজের জমিতে বসবাসের সুযোগ করে দেন। একইভাবে অসম থেকে পুরোহিত এবং ঢাকি এনে বসবাসের জায়গা দেওয়া হয়।
ওই সময় পুজো দেখার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে থেকে প্রচুর মানুষ আমগুড়িতে ভিড় করতেন। পুজো মণ্ডপে দাঁড়িয়ে অনিল বসু আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘বসুনিয়া বাড়ির পুজো দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে। কিন্তু বর্তমানে অত্যাধুনিকতার ছোঁয়া ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রামের মানুষ এই পুজোকে সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না। প্রত্যেকেই এখন বিগ বাজেটের সুবিশাল পূজা মন্ডপ, আলো রোশনাই গান বাজনা এসব স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।’
বহু কষ্টে ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বসুনিয়া পরিবার। আমগুড়ি থেকে মাত্র ঢিল ছড়া দূরত্বে ময়নাগুড়ি শহর। সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর স্থানীয় ক্লাব বিগ বাজেটের পুজো করায় মানুষ সেদিকে বেশি ভিড় জমায়। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা মিলেই বসুনিয়া বাড়ীর এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন।