লক্ষ্মী মানেই কি শান্ত, বাধ্য, সংসারমুখী এক নারী? যিনি পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফোটাবেন, সংসারের সুখ-সমৃদ্ধি বজায় রাখবেন, অথচ নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন কিংবা পছন্দ-অপছন্দকে সব সময় সরিয়ে রাখবেন? সমাজের চোখে লক্ষ্মী মেয়ের সংজ্ঞা কি আজও এমনই? সময় বদলেছে, বদলেছে নারীর জীবনযাপন, কাজের ধরন এবং নিজের পরিচয় গড়ে তোলার লড়াই। ফলে আজকের দিনে লক্ষ্মীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলানো প্রয়োজন বলেই মনে করেন অভিনেত্রী সন্দীপ্তা সেন৷
সন্দীপ্তার মতে "আজকের পৃথিবীতে লক্ষ্মী এমন এক নারী, যিনি নিজের চারপাশের মানুষের জীবনে খুশি, আনন্দ, শক্তি এবং সমৃদ্ধি আনার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন৷ কিন্তু অন্যদের ভাল রাখতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন না। তাঁর কাছে সংসারের সুখ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নিজের মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও সমান মূল্যবান। তিনি জানেন, অন্যের পাশে দাঁড়ানোর অর্থ নিজের প্রয়োজনকে অস্বীকার করা নয়। বরং নিজের পরিচয় অটুট রেখেও মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আজকের লক্ষ্মীরা স্বয়ংসম্পূর্ণ৷ আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনযাপন করেন আজকের লক্ষ্মীরা৷
তবে শুধু কর্মরতা নয়, সন্দীপ্তার চোখে ঘরে থাকা মহিলাটিও লক্ষ্মী, এমনকি যে মেয়েটি জীবনের লক্ষ্যপূরণ করতে মরিয়া সেও লক্ষ্মী৷ অভিনেত্রী বলেন, " এই লক্ষ্মী কখনও সংসার সামলানো গৃহবধূ, কখনও কর্মক্ষেত্রে নিজের দক্ষতায় পরিচিতি তৈরি করা মহিলা। কেউ উদ্যোগপতি, কেউ শিল্পী, আবার কেউ এখনও নিজের জীবনের লক্ষ্য খুঁজছেন। প্রত্যেকের জীবন আলাদা, লড়াই আলাদা, স্বপ্নও আলাদা। তাই কোনও নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে একজন নারীকে বিচার করা যায় না। তিনি কী পোশাক পরেন, কতটা চুপচাপ থাকেন কিংবা পরিবারের প্রত্যেকের কথা মেনে চলেন কি না, তার উপর নির্ভর করে তাঁর চরিত্রের মূল্যায়ন হওয়া উচিত নয়। বরং তাঁর সহমর্মিতা, আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং জীবনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতাই তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে।"
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, আধুনিক সমাজ কি সত্যিই নারীকে নিজের মতো করে বাঁচার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দিয়েছে, এখনও অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের কাছ থেকে মানিয়ে নেওয়া, চুপ করে থাকা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করে চলার প্রত্যাশা করা হয়। কেরিয়ার এবং সংসার সামলাতে গিয়ে মেয়েদের শুনতে হয় 'বাইরে কাজ করার অনুমতি দিলাম'। কোনও মহিলা নিজের মতামত স্পষ্টভাবে জানালে কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাঁকে অনেক সময় ‘ঠোঁটকাটা’, ‘জেদি’ অথবা ‘বড্ড রাগী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। অথচ একই আচরণ কোনও পুরুষের মধ্যে দেখা গেলে তাঁকে আত্মবিশ্বাসী বা দৃঢ়চেতা বলে প্রশংসা করা হয়।
সন্দীপ্তার মতে, "এই দ্বিচারিতার পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ, ভদ্র হওয়া মানে বাধ্য হওয়া নয়, আর নিজের অধিকারের পক্ষে কথা বলা মানেই বদমেজাজি হয়ে যাওয়া নয়। একজন নারী একই সঙ্গে কোমল, সহানুভূতিশীল এবং দৃঢ় হতে পারেন। প্রয়োজনে তিনি অন্যের পাশে দাঁড়াবেন, আবার নিজের সীমারেখা লঙ্ঘিত হলে প্রতিবাদও করবেন। এর কোনওটিই তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী নয়। আসলে, লক্ষ্মী হওয়ার অর্থ শুধু অন্যের জীবনে সুখ নিয়ে আসা নয়, নিজের জীবনেও সেই সুখ খুঁজে নেওয়া। যে নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, নিজের ভুল থেকে শিখতে পারেন এবং নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য এগিয়ে যেতে পারেন, তিনিও সমানভাবে লক্ষ্মী। সমাজের তৈরি করা কোনও আদর্শের সঙ্গে নিজেকে মেলানোর জন্য তাঁকে নিজের কণ্ঠস্বর রোধ করতে হবে না৷"
"আজকের লক্ষ্মী তাই শুধু সমৃদ্ধির প্রতীক নন, তিনি আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা এবং আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক। অন্যের জীবনে আলো ছড়ানোর পাশাপাশি নিজের আলোয় বাঁচতে জানেন যিনি, প্রকৃত অর্থে তিনিই আজকের লক্ষ্মী", সন্দীপ্তার সংযোজন।