ছোটবেলা কেটেছে মফস্বলে চন্দনগরে। কলেজবেলায় কলকাতায় আসা আর তারপর কর্মসূত্রে মুম্বইতে৷ মনের মধ্যে রয়ে গিয়েছে দূর থেকে ভেসে আসা গান, শরতের আকাশ, ছোটবেলার হুল্লোড়৷ সুদূর মুম্বইতে বসেও গায়িকা জুন ব্যনার্জি মহালয়া পেরোলেই মনের মধ্যে দেখতে পান কাশফুল দুলছে হাওয়ায়, কেমন ছিল ছোটবেলার পুজোর দিনগুলো? আজকাল ডট ইন-এ পুজোর স্মৃতি উজার করে দিলেন জুন ব্যানার্জি।
ছোটবেলার পুজোর কথা বলতে গিয়ে জুন বলেন, "কলকাতায় যখন ছোটবেলায় থাকতাম তখন মহালয়ার পর থেকেই আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, নীল আকাশ দেখলেই মনে হত পুজো এসে গেছে৷ মুম্বইতে নবরাত্রির চল বেশি৷ যখন প্রথম মুম্বইতে আসি তখন দুর্গাপুজো হত না তেমন৷ তবুও মহালয়া হয়ে গেলেই মনে হয় যেন কাশফুল দেখতে পাচ্ছি৷ বাঙালিরা বাংলা থেকে দূরে থাকলেও মনের মধ্যে বাংলাটা থেকে যায়৷ আমি চন্দননগরের মেয়ে। আমার ছোটবেলায় চন্দনগরে দুর্গাপুজো কম হত, জগদ্বাত্রী পুজোর অপেক্ষাই থাকত। দুর্গাপুজোয় স্কুল ছুটি পড়ে যেত৷ আমি বাড়িতে বইমুখে নিয়ে বসে থাকলে মা বলত একটু ঘুরে আয়, পুজোর আমেজটা মেখে নেওয়া। অষ্টমী নবমীতে কাকার বাড়ি আসতাম৷ সব বাচ্চারা খেলতাম, পুজোর সময়েই বন্ধুত্ব হত, দৌড়াদৌড়ি, হইচই। দশমীতে বিসর্জনের পরে আলতা দিয়ে দুর্গানাম লেখার রীতি ছিল আমাদের বাড়িতে৷ এরপর কলকাতায় যখন থাকতে শুরু করলাম, তখন পুজোয় শাড়ি পরে সেজে বন্ধুদের সঙ্গে ম্যাডক্সে যেতাম৷"
পুজো মানেই খাওয়াদাওয়া, সাজগোজ। জুনের সুন্দর চুলের রহস্য কী? সাজগোজ নিয়েই বা কী ভাবেন? জুন বলেন," ছোটবেলার পুজোতে সাজগোজ নিয়ে উন্মাদনা ছিল৷ ভাল ভাল জামা বেছে রাখতাম অষ্টমী নবমীর জন্য৷ এখন যা হোক কিছু পরলেই হল৷ চুলে রোজ তেল দিয়ে সারারাত রাখি, পরদিন শ্যাম্পু মাঝেমধ্যে একটু হেয়ার স্পা ব্যাস৷ আগে তো চুলে টকদই লাগিয়ে রাখতাম৷ চুলটা সফট হত৷ আমি যখন বম্বেতে এসেছি, তখন সদ্য অভিজিৎদার ( গায়ক অভিজিৎ ভট্টাচার্য) লোখান্ডওয়ালার পুজো শুরু হচ্ছে। সেখানে যেতাম, অনেকের সঙ্গে দেখা হত৷ এখন তো অনেক সময় পুজোয় থাকা হয়না। আর ছোটবেলায় নতুন জামা পরার যে মজাও সেটাও এখন নেই৷ বাড়ির সকলের জন্য কেনাকাটা করি একটু৷"
পুজো মানে গানও৷ গান ছাড়া পুজো তো ভাবা যায়না৷ সময়ের সঙ্গে বদলেছে গানের ধরন, ভাষা, এমনকি অপেক্ষাও৷ জুনের কাছে পুজোর গানের মানে কী? আজকাল ডট ইন-এর প্রশ্নে জুন বলেন, "আমি যখন বড় হচ্ছি তখন মানে আর ডি বর্মন কিশোর কুমার লতাজি ছিলেন, পুজোর সময় কুমার শানুর গান খুব বাজত প্যান্ডেলে৷ পুজোর নতুন গানের অপেক্ষা ছিল৷ টেপরেকর্ডারে ক্যাসেটের ফিতে জড়িয়ে যাচ্ছে পেনসিল দিয়ে ঘুরিয়ে ঠিক করছি৷ এখন পুজোয় দুর্গা এল উমা এল কাশফুল ঢাক বাজছে এই জাতীয় গান প্রকাশিত হয় তখন কিন্তু নানা ধরনের গান ছিল, প্রেমের গান, ফোক রবীন্দ্রসঙ্গীত সব৷ পুজোটা তখন অনেক বেশি কালচারাল ছিল৷ গানের তো এক্সপায়ারি ডেট হয় না তাই বছর বছর উমা এল, গৌরী আইল এই ধরনের শুনতে কিছুটা একঘেয়ে লাগে৷ আর একটা বিষয় মিস করি, আগে রাত্রিবেলা দূর থেকে গান ভেসে আসত৷"
একসময় বাতাসে গুনগুন আর উলাললা প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজত৷ নিজের গান এত জনপ্রিয় হল কেমন ছিল সেই দিনগুলি? যদিও অনেক আগেই এক নামী বিমানসংস্থার জন্য গান গেয়েছিলেন জুন৷ জুনের সংযোজন,"চিরদিনই তুমি যে আমার পুজোর আগেই রিলিজ করেছিল৷ আমাদের আদি বাড়ি ভদ্রেশ্বর তেলেনিপাড়ায়, ওখানে আমাদের ব্যানার্জি বাড়ির মন্দির আছে৷ পালা করে পুজো হয়৷ ৩৬ বছর পর পর পালা আসে৷ তো সেইবছর পাড়ার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে সারাদিন যখন বাজছে বাতাসে গুনগুন বা উ লাল লা, আমাকে আত্মীয়রা ফোন করে বলছে খুব আনন্দ হয়েছিল৷ আগে যখন লতাজি আশাজির গান পুজোর প্যান্ডেলে শুনতাম তখন হয়তো ম্যানিফেস্ট করেছিলাম৷ বাড়িতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, দূর থেকে আমার গান ভেসে আসছে, মনে হচ্ছিল চেঁচিয়ে বলি আরে এটা আমি গেয়েছি৷ এমনকি এক আত্নীয়ের বাড়ি যাচ্ছিলাম রিকশা করে, দুটো ছেলে বাইকে আমারই গান গেয়ে আমাকে প্যাক দিয়ে চলে গেল৷ এটা অদ্ভুত ফিলিং কারণ একটা গান তো টিমওয়ার্ক, সকলেই ভাল করে করার চেষ্টা করেন কিন্তু গান হিট হওয়াটা একটা ম্যাজিক৷ অনেক সময় অনেক ভাল গান, অনেক ভাল মিউজিশিয়ান কাজ করার পরেও হিট হয় না। এই সব গানগুলোর ক্ষেত্রে কিছু তো একটা হয়েছিল৷"
গান নিয়ে কেরিয়ার করার আগে তো বম্বেতে চাকরি করতেন৷ লোখান্ডওয়ালায় পুজোয় বাবা মা দিদির সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে টাকা দিয়ে পাস জোগাড় করে ঢুকেও পড়েছিলেন৷ তখনও জানতেন না আগামীতে জীবন কীভাবে সাজিয়ে দেবে সুরের ডালি৷ জুন বলেন, "তখন তো কেউ চেনে না৷ পাস না হলে ঢোকা যাবে না। একজন মহিলা এসে বললেন পাস আছে, বাবা আমাকে যেতে বলল৷ শান, সুনিধি, শ্রেয়া, উদিতজি সকলে গান গাইছেন৷ শান যখন গাইছেন আমার মনে হল ইস যদি অডিয়েন্স থেকে কাউকে ডাকে, আমি গাইতে চলে যাব, তার ঠিক ছয়-সাত মাসের মধ্যে আমি ওর সঙ্গে কাজ করলাম এবং বাতাসে গুনগুন রিলিজ হল, সেই বছর পুজোয় লোখান্ডোয়ালাতেও শানের সঙ্গে গাইলাম৷"
প্রজন্ম বদলায়, থেকে যায় কিছু স্মৃতি রীতি ঐতিহ্য৷ শিল্পীর জীবনেও তার অন্যথা হয়নি৷ জন্মাষ্টমীতে তালের বড়া বানিয়ে ছবি পোস্ট করেছিলেন জুন৷ তিনি কি রন্ধন পটিয়সী? জুন জানান, " এখন পুজোয় বম্বেতে থাকলে চেষ্টা করি ভোগ খাওয়ার, অঞ্জলি দেওয়ার৷ আর মায়ের বয়স হয়েছে৷ তাই এখন ট্র্যাডিশনটা ধরে রাখার চেষ্টা করি৷ জন্মাষ্টমীতে তালের বড়া, গনেশ চতুর্থীতে মোদক বানিয়েছিলাম৷ বেশ মজা লাগে৷"
মফস্বল থেকে বড় শহরে পাড়ি দেওয়া প্রতিটি বাঙালির কাছেই দুর্গাপুজো আসলে এক আবেগ৷ বাইরের আড়ম্বর, হইচই সবকিছুর ভিড়ে নিভৃতে বয়ে চলে অপার আনন্দের এক ফল্গুধারা যে আনন্দধারায় জীবন সেজে ওঠে নবরূপে৷ শরতের আলো ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে শহর পেরিয়ে প্রবাসে কিংবা ছোট্ট কুঁড়েঘরে৷