Loading...

‘ভিড়ে থাকব, কিন্তু মিশে যাব না’, মফস্‌সল, ধুনুচি নাচ পুজোবার্ষিকীর গন্ধমাখা পুজোর স্মৃতিতে ডুব লোকনাথ দে-র

এই মুহূর্তে বাংলা ছবি ও ওয়েব সিরিজে তিনি চর্চিত অভিনেতা। সৃজিত মুখোপাধ্যায়, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, অঞ্জন দত্ত, মৈনাক ভৌমিক পরিচালিত একের পর এক বড় বড় তারকাসর্বস্ব ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। বলা ভাল, করে চলেছেন। আবার বাংলাদেশের প্রথম সারির নায়ক সাকিব খানের ছবিতেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। সঙ্গে বাংলার মঞ্চ তো আছেই। তিনি, লোকনাথ দে। পর্দায় চরিত্র বদলের খেলা চললেও, লোকনাথের শিকড় কিন্তু আটকে রয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার হাবড়ায়। অভিনেতার ভাষায়, “যা ব্যাকরণ মেনে পুরোপুরি মফস্‌সল।” বর্তমানে নিউ ব্যারাকপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও উৎসবের আবহে অতীত আর বর্তমানকে এক সুতোয় বেঁধে স্মৃতিকাতর হলেন অভিনেতা।

দুর্গাপুজো হচ্ছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসব। তবে এখন আবার উৎসব শব্দটা নিয়েও একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমরা কোনওদিন দুর্গাপুজোকে এত জটিল করে ভাবিনি, ভাবি না এবং ভাবতে চাইও না। আমি আশৈশব বড় হয়েছি মফঃস্বলে । ছোটবেলা থেকে দেখেছি আমার ক্লাব -হাবড়া অ্যাথলেটিক ক্লাবের পুজোর মাস দেড়েক আগে থাকতেই যেখানে প্যান্ডেল হবে তার আশেপাশেই প্রতিমা গড়া হতো আবার কখনও বা বাইরে থেকে প্রতিমা কিনে আনা হত। সেটা একেবারে আটের দশকে গোড়া। ওই সময় পাড়ার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে প্যান্ডেলের বাঁশ-ত্রিপল পড়লেই খেলাধুলো শুরু হয়ে যেত আমাদের। তারপর একটু বড় হলাম। তখন পাড়ার পুজোর দায়িত্ব নেওয়া শুরু করলাম আমরা। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, একটা সময় পর্যন্ত নতুন জামাকাপড় নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ছিল আমার। বিশেষ করে পুজোর সময়। মনে আছে বাবা কাজ থেকে ফিরে আমাদের ভাই-বোনদের রাত্রেবেলায় পুজোর জামাকাপড় কিনতে নিয়ে যেতেন। সেটা পঞ্চমী-ষষ্ঠী রাত হবে। মফঃস্বলে রাত আটটা বেজে গিয়েছে, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছি...সেই ডেকে কাপড়-জামা কিনতে নিয়ে যেতেন। ভারি মজা হত। তখন তো এত ফ্যাশন ছিল না। চার-পাঁচ রকমের রং ঘুরত, অন্যদিকে জুতোর ক্ষেত্রেও চার-পাঁচ রকমের ডিজাইন ঘুরত...ওর মধ্যেই কেনাকাটি চলত। আসলে তখন ছিল কার জামা-প্যান্ট-জুতো কতদিন টিকবে। টেকসইয়ের ব্যাপারটা নিয়ে মাতামাতি ছিল। কিন্তু ১৫-১৬ বছর বয়স হওয়ার পরেই ওই পুজোর জামাকাপড় পাওয়ার নেশাটা কেটে যায় পুরোপুরি।

ADVERTISEMENT

এরপর ক্লাবের পুজোর দায়িত্ব আমরা অল্প অল্প করে পেতে থাকলাম। আস্তে আস্তে নিজের গোটা পাড়াটাকে গভীরভাবে চেনা শুরু করলাম। প্রত্যেকের নাম জানা, কোন বাড়িতে কতজন সদস্য, কার বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন...মানে পাড়ার সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়ল আমার এই পুজোর দৌলতেই। অদ্ভুতভাবে একটা আত্মীয়তা বাড়ল। পাড়ার পাশাপাশি দোকানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদা চাওয়া নিয়ে দর কষাকষি যে ব্যাপারটা -এটাও খুবই উপভোগ করেছি সেই সময়ে। তারপর পুজোর দিনে সবাইকে যত্ন করে ভোগ দেওয়া, একসঙ্গে পাত পেড়ে খাওয়া, ঢাক বাজানো, একটু ধুনুচি নাচ নেচে দেওয়া...পুরো পাড়াটা সেই সময়ে ব্যক্তিগত মিলনক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াত।

আরও পড়ুন

আমি না কখনও ঘুরে ঘুরে প্যান্ডেল দেখা, ঠাকুর দেখতাম না। মানে খুব একটা পছন্দ ছিল না বিষয়টা। এক-আধদিন নিশ্চয়ই হয়ত বেড়িয়েছি ভ্যান-রিকশা নিয়ে অথবা অটো নিয়ে নিতাম...এই আর কী। আমার লক্ষ্য ছিল পাড়ার প্যান্ডেলের সামনে বেঞ্চি-চেয়ারে জমিয়ে আড্ডা দেব আর মানুষের ভিড় দেখব। ওই বয়স থেকেই মানুষকে লক্ষ্য করতে খুব ভাল লাগত। কার অঙ্গভঙ্গি কেমন, কে কেমনভাবে হাঁটছেন। মানে বলতে চাইছি, আমার কিন্তু ভিড় ভীষণ লাগে তবে দূর থেকে। নানান কিসিমের অসংখ্য মানুষ সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছেন আর আমি সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে তাঁদের দেখছি, এই বিষয়টি আমার ভীষণ পছন্দের। মানে ভিড়ে থাকব কিন্তু মিশে যাব না!

আমি কিন্তু কলকাতার পুজো সেভাবে আজও দেখিনি। সত্যি দেখিনি। মানে প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে যেহেতু প্রতিমা দেখি না, তাই। তাই বলে কী কিছুই খেয়াল করিনি? তা নয়। শ্যামবাজারে আমাদের নাটকের মহড়ার জায়গা ছিল। পঞ্চমী পর্যন্ত চলত, তাই সেসব সেরে ওই চত্বরটা এক পাক মেরে দিলাম হেঁটে অথবা ধরুন ষষ্ঠীর দিন দক্ষিণ কলকাতার মধুসূদন মঞ্চে শো, সেসব শেষ হলে ফেরার সময় রাস্তা থেকেই চোখে পড়ে যেত প্যান্ডেল-প্রতিমা...এই আর কী। আর কলকাতায় বরাবরই তৃতীয়া-চতুর্থী থেকে মানুষের ঢল নেমে যেত, তাই শুনতাম অনেকেই নাকি সপ্তমীর দিন পরিবার সহ বাইরে ঘুরতে চলে যাচ্ছেন। শুনে হাঁ হয়ে যেতাম। কারণ আমাদের মফঃস্বলে তো ষষ্ঠীর দিনেই প্রতিমা আসত এবং পুজো শুরু হত সেখানে কলকাতায় সপ্তমীর দিনেই লোকজন ঠাকুর দেখা সেরেটেরে বাইরে চলে যাচ্ছে শুনলে অবাক হবে না!

কৈশোর-যৌবন থেকেই পূজাবার্ষিকী নিয়ে আগ্রহ ছিল। আজও আছে। নিজেদের বন্ধুদের মধ্যে কিন্তু তখন এই পুজোবার্ষিকী দেওয়ার রেওয়াজ ছিল আমাদের। তারপর তা ভাগাভাগি করে পড়া। এখন পুজোর সকাল-দুপুরগুলোতে কোনও কাজ রাখি না, তাই সেই সময়টায় বুকের তলায় বালিশ রেখে, ফুরফুরে মেজাজে পূজাবার্ষিকীগুলোর পাতা উল্টোই। আর পুজোর খাওয়াদাওয়া নিয়েও কিন্তু বেশ একটা উত্তেজনা কাজ করত। তখন আমাদের মফঃস্বলে ছোট-ছোট হোটেল। খোঁজ চালাতাম কোথাকার মোগলাইটা সুস্বাদু। কারণ মোগলাই তখন দারুণ হিট ব্যাপার ছিল। আর সেই সময়ে মোগলাই-মাংস খাওয়া মানে বিরাট ব্যাপার! আর যেহেতু পুজোর সময় ঠেকে বসে আড্ডাটা তখনও মারতাম আর আজও মারি, তাই আড্ডার ফাঁকে মুখ তো চলেই। কেউ লাড্ডু আনছে তো কেউ গরম-গরম চানাচুর, কেউ বা ঠান্ডা পানীয়। আর এখন তো পুজোর সময় রেস্তরাঁয় গিয়ে সবাই জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করাটা একটা রীতি হয়েই দাঁড়িয়েছে আমাদের। আর একটা কথা, পুজোতে পরিবারের সঙ্গে ফুরফুরে সময় কাটানোর সুযোগও পাই। এটাও কিন্তু আমার কাছে বড় পাওনা।

শেষ করব আর একটা রীতির কথা বলে। এখন আমি নিউ ব্যারাকপুরে পাকাপাকিভাবে থাকি। তার মানে এই নয় যে নিজের ছোটবেলার পাড়াকে ভুলে গিয়েছি। প্রতি বছর অষ্টমীর বিকেলে আমি ও আমার হাবড়ার পাড়ার বন্ধুবান্ধবেরা সবাই মিলে বাইকে চেপে হাবড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল, গ্রামে ঠাকুর দেখি, পায়ে হেঁটে ঘুরি ছোটবেলার মতো সেই নিরালা, সহজ পুজোর আমেজের ছোঁয়াটা পাওয়ার আশায়। সঙ্গে বন্ধুত্বের উষ্ণতা-টা ফাউ।”

ADVERTISEMENT