Loading...

পুজোর আনন্দে নিজেকে একা মনে হয়? রাগ, বিরক্ত, বিষাদ পেরিয়ে কীভাবে সামলাবেন আপনজনকে, পরামর্শ দিচ্ছেন মনোবিদ অনন্যা সেনগুপ্ত

  • সায়নী মুখার্জি

  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০:১২

পুজোর দিন চারপাশে হইহুল্লোড়, আনন্দ উৎসব৷ তবু কিছু মানুষকে গ্রাস করে বিষাদ৷ কিছুই যেন ভাললাগে না৷ বাড়ির মানুষেরা বেরোতে বললে বেরোবেন না৷ কথা বলা আনন্দ করা সবকিছু থেকে নিজেকে কোন এক জেদে যেন সরিয়ে রাখার পণ। কেন এমন হয়? বাড়িতে এমন মানুষ থাকলে কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবেন৷ কীভাবে বিষণ্ণ মানুষটির পাশে থেকেও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখবেন, আজকাল ডট ইন-কে হদিশ দিলেন মনোবিদ অনন্যা সেনগুপ্ত৷

কীভাবে বুঝবেন মানুষটির ডিপ্রেশন হয়েছে?

ADVERTISEMENT

মনোবিদ বলেন, "অনেকদিন মন ভাল নেই। আগে যে কাজগুলো ভাল লাগত করতে এখন সে কাজগুলো ভাল লাগছে না। ইন্টারেস্ট পাচ্ছেন না৷ এনার্জি কম। ঘুম কম হচ্ছে৷ জীবন এবং নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ভাবনা তৈরি হচ্ছে৷ এর ফলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশাগত, সামাজিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে, শেষ মুহূর্তে প্ল্যান ক্যানসেল করছেন, এমন যদি ছয় মাসের অতিরিক্ত সময় থাকে তাহলে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে ধরা হয়৷ তবে সবসময় যে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের রোগীর ক্ষেত্রেই মনখারাপ হয় এমন নয়৷ পুরনো কোনও ক্ষত, আঘাত, দুর্ঘটনা, চাকরি হারানো, আকস্মিক মৃত্যু থেকেও এমন মনখারাপ হতে পারে বলে জানান মনোবিদ৷ তাঁর মতে দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে আবেগের৷ তাই প্রত্যেকেই নিজের মতো করে আনন্দ করতে চান৷ কিন্তু যারা পারছেন তার মানে কিন্তু এটা নয় যে, তাঁরা ইচ্ছে করে করছেন না। বা দুঃখ বিলাসী".

আরও পড়ুন

বহু বাড়িতে শাশুড়ি বৌমার মধ্যে একটা সমস্যা থাকে৷ যেখানে বৌমা অভিযোগ করেন, বরের সঙ্গে সময় কাটাতে চাইলে শাশুড়িমা অহেতুখ খারাপ ব্যবহার করেন, বা এমন কিছু বলেন যেখানে অশান্তি তৈরি হয় এবং আন্নদের মেজাজটা নষ্ট হিয়ে যায়৷ এটা কি ডিপ্রেশন? মনোবিদ বলেন, এটা ডিপ্রেশন নয়, এটা গোঁড়া মানসিকতা হতে পারে৷ অধিকার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া বা তিনি করতে পারেননি তাই নতুন আসা মেয়েটিকে করতে না দেওয়ার নেতিবাচক মানসিকতা থেকেও হতে পারে৷ আবার এটাও হতে পারে সেই ব্যক্তির আবেগ প্রকাশে এতটাই সমস্যা যে তিনি এমন কিছু করেন বা বলেন যা দেখে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় উনি সমস্যা তৈরি করতে চাইছেন৷ ধরা যাক, পুজোর সময় ছেলে বউ বেরোতে চাইছেন শাশুড়ি বেরোবেন না। তাঁকে একা রেখে যেতেও ভাল লাগছে না৷ এদিকে সেই শাশুড়ি হয়তো নিজেই নিজের মধ্যে অপরাধবোধে ভুগছেন৷ বা হয়তো ভাবছেন আমি তো আমার সময় এমনভাবে মজা করতে পারিনি৷ এই ধরনের বহু সমস্যা আসে৷

এই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে যদি দেখা যায় বেরোতে চাইছেন না বা শেষ মুহূর্তে প্ল্যান ক্যানসেল করছেন তাহলে তাকে কোনও রকম নেতিবাচক কথা বলা যাবে না৷ কোনও তুলনা টানা যাবে না৷ তোমার জন্য মজা করতে পারছি না, এই তো পাঁচদিন ওর তো কত সমস্যা তবুও ও বেরিয়েছে৷ বা হয়তো এমন কেউ যিনি প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তিনি ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছেন তখন তাঁকে দেখিয়ে বলা হল উনি তো দুঃখ পেয়েছেন তবুও পুজোতে বেরোলেন৷ এই ধরনের কথা বলাই ভুল৷

মনোবিদের মতে, বিষাদগ্রস্ত মানুষের দুঃখকে ছোট করে দেখার পরিবর্তে তাঁর দুঃখকে সহানুভূতি এবং সহমর্মিতার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে৷ কখনও বলা যাবে না তোমার জন্য এত কিছু প্ল্যান করলাম আর তুমি এখন যাবে না! টাকার পাহাড়ে বসে থাকলেও ডিপ্রেশন হতে পারে।

কী করবেন?

বিষাদগ্রস্ত মানুষকে স্পেস দিতে হবে৷ তাঁকে বলা যেতে পারে, "আমি বুঝতে পারছি তোমার ভাল লাগছে না বেরোতে। আমরা পাশের ঘরে রয়েছি। তোমার যদি মনে হয় তুমি আমাদের সাথে একটু কথা বলবে সেটা বলতে পারো।"

মনোবিদের মতে, খেয়াল রাখতে হবে যেন সে রোজের রুটিন ঠিক রাখে, যদি দেখা যায় আত্মহত্যার প্রবণতা আছে সেক্ষেত্রে তাঁকে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না৷ আনন্দের দিনে সুইসাইডাল থট ট্রিগার করে। অবশ্যই কোনও রকম খারাপ মন্তব্য করা যাবে না৷ তুই কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? এই ধরনের কথা বলা যাবে না৷ যদি ডিপ্রেশন মারাত্নক হয় সেক্ষেত্রে 14416 নাম্বারে ফোন করা এবং যদি কাছাকাছি সাইকিয়াট্রিস্ট সাইকোলজিস্ট কেউ থাকেন তাকে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।

এখানেও অন্য সমস্যা আছে৷ এখন বেশিরভাগ মানুষ কর্মসূত্রে অবসর পান না। পুজোর চারদিন বন্ধু আত্মীয়দের সঙ্গে পরিকল্পনা থাকে৷ এইসময় বাড়িতে বিষাদগ্রস্ত কেউ থাকলে তাঁর কারণে আনন্দ করতে না পারলেও ক্ষোভ তৈরি হয়৷ এই সমস্যার সমাধানে মনোবিদের পরামর্শ, বাড়ি এবং বাইরে দুই দিকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে৷ একটা বাউন্ডারি বা সীমারেখা নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। সারারাত ঠাকুর দেখার প্ল্যান না করে কয়েক ঘণ্টার প্ল্যান করা যেতে পারে৷ ফিরে এসে কিছুক্ষণ বাড়ির মানুষটির সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে৷ বাইরে থেকে তার পছন্দের খাবার কিনে আনা যেতে পারে৷ তাঁর পছন্দের গান বা সিনেমা চালিয়ে দিয়ে বেরোনো যেতে পারে৷

ডিপ্রেশনে থাকা মানুষকে কি বাড়ির আশেপাশে বেরোনোর জন্য জোর করা যেতে পারে? আজকাল ডট ইন-এর প্রশ্নে মনোবিদ বলেন, অবশ্যই। তাঁকে বলতে হবে তোমার মনখারাপ আমি পারছি কিন্তু তুমিও যে একবারও বেরোলে না এটা আমার কাছেও খারাপ লাগছে৷ তাই আমরা কিছুক্ষণ বেরোতে পারি৷ আমি তোমার দিকে হাতটা বাড়াচ্ছি তুমিও আমার হাতটা ধরো৷ তবে এতটাও জোর করা যাবে না যেখানে বেরোলেন কিন্তু সারাক্ষণ গোমড়া মুখে রইলেন৷ কারণ বয়স এবং সময়ের পরিবর্তন হলে মজা করার ধরন বদলায়৷

ADVERTISEMENT