Loading...

প্রশান্ত মহাসাগরের পারে ঐকতানের সুর, অরেঞ্জ কাউন্টির বাঙালির ঘরে ফেরার গল্প

আজকাল ওয়েবডেস্ক: ধরা যাক, অক্টোবরের এক সকাল। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশ ঝকঝকে নীল, কিন্তু সে নীলে শরতের পেঁজা তুলোর মতো মেঘ নেই, বাতাসে শিউলির গন্ধ নেই, ভোররাতে রেডিওয় মহালয়ার সুর নেই, পাড়ার মোড়ে বাঁশ বাঁধার ঠুকঠাক শব্দও নেই।

অরেঞ্জ কাউন্টির এক বাড়ির রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে এক প্রবাসী মামো মোবাইলের পর্দায় কলকাতার প্যান্ডেলের ছবি দেখছেন। পাশের ঘরে তাঁর ছেলে হোমওয়ার্ক করছে। সে জানেই না, ঢাকের বোল কানে এলে বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে।

ADVERTISEMENT

এ ছবি কোনও একজনের নয়। অরেঞ্জ কাউন্টির বহু বাঙালি পরিবারের কাছে বছরের পর বছর দুর্গাপুজো মানে ছিল দূরের কোনও শহরে ছুটে যাওয়া, হাইওয়ের লম্বা যানজট পেরিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য মায়ের মুখ দেখে আসা। নিজের পাড়ায়, নিজের লোকেদের মাঝে পুজো ছিল দূরের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটাকেই সত্যি করার গল্প ঐকতান।

আরও পড়ুন

নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মন্ত্র: ঐকতান মানে নানা যন্ত্র, নানা কণ্ঠ মিলে একটাই সুর। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের এক বিখ্যাত কবিতার নামও ঐকতান। নামটা যে নিছক শখে রাখা নয়, তা এই সংগঠনের পথচলা দেখলেই বোঝা যায়। কেউ এসেছেন কলকাতা থেকে, কেউ দুর্গাপুর, কেউ বা ভুবনেশ্বর কিংবা নতুন দিল্লি থেকে। আলাদা শহর, আলাদা পেশা, আলাদা গল্প, অথচ সুর একটাই, বাঙালিয়ানার সুর।

আড্ডা থেকে আন্দোলন: শুরুটা কয়েকটি বন্ধু-পরিবারের ঘরোয়া আড্ডা থেকে। চায়ের কাপে তর্ক, গানের লড়াই, পিকনিকের হইচই, আর তার মাঝেই একদিন কেউ প্রশ্নটা তুলে ফেললেন: ‘আমরা নিজেরাই একটা পুজো করি না কেন?’

প্রশ্নটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার অরেঞ্জ কাউন্টিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বন্ধুদের দল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হল অলাভজনক সংস্থা হিসেবে: ঐকতান সো-ক্যাল অ্যাসোসিয়েশন।

সেই থেকেই শুরু ঐকতানের আনুষ্ঠানিক পথচলা। পুরোটাই চলে স্বেচ্ছাসেবকদের কাঁধে ভর করে। লক্ষ্য একটাই: বাংলা ও পূর্ব ভারতের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক ঐতিহ্যকে প্রবাসের মাটিতে বাঁচিয়ে রাখা, আর পরের প্রজন্মের হাতে সেই ব্যাটন তুলে দেওয়া।

প্রথম বোধন: নিজেদের উঠোনে মা: ২০২৪ সালের শরৎকাল। টাস্টিনের চিন্ময় মিশনে প্রথমবার বসল ঐকতানের দুর্গাপুজো। আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল এক মন-ছোঁয়া কথা: যে পরিবারগুলো বছরের পর বছর অরেঞ্জ কাউন্টিতে একটা পুজোর অপেক্ষায় ছিল, এবার পুজো তাদের নিজেদের উঠোনেই। অরেঞ্জ কাউন্টির বাঙালিদের নিজেদের পাড়ার পুজো।

পুজোর সূচনা জমজমাট এক সন্ধ্যায়, মঞ্চে বাবুল সুপ্রিয়র লাইভ কনসার্ট। আরভাইন, লেক ফরেস্ট, লাগুনা হিলস, অ্যালিসো ভিয়েহো থেকে শুরু করে সান্তা আনা, এমনকি সান দিয়েগো থেকেও মানুষ এলেন।

চারশোরও বেশি মানুষের ভিড়ে সেদিন চিন্ময় মিশনের হলঘর যেন এক টুকরো কলকাতা। ভারত থেকে আসা শিল্পীদের পাশাপাশি মঞ্চে উঠলেন ঐকতানের নিজেদের সদস্যরাও। কেউ গাইলেন, কেউ নাচলেন, কেউ বা আবৃত্তিতে চোখ ভেজালেন।

গত বছরের পুজো: ঢাক, ধুনুচি আর ভোগের গন্ধ: ২০২৫ সালে পুজো হয়েছিল ২৬ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর, টাস্টিনের এই চিন্ময় মিশনে। শুক্রবার বিকেলে বোধন দিয়ে শুরু। তারপর তিন দিন জুড়ে চলল পুষ্পাঞ্জলি, কুমারীপুজো, সন্ধিপুজোর গম্ভীর মুহূর্ত, দুপুরে পাতা পেড়ে ভোগ খাওয়া আর সন্ধেয় ঐকতানের সাংস্কৃতিক দলের অনুষ্ঠান। গানের আসর জমালেন সুস্বতী মল্লিক।

ঢাকের তালে তালে যখন ধুনুচি নাচ শুরু হল, তখন বোঝা গেল প্রবাসেও আবেগ এতটুকু ফিকে হয়নি। ধোঁয়ার কুণ্ডলির ভেতর থেকে কেউ হয়তো দেখতে পেলেন নিজের ছেলেবেলার পাড়া, বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার রাত। আর দশমীতে সিঁদুর খেলায় রাঙা মুখগুলো জানিয়ে দিল, ‘আসছে বছর আবার হবে!’

পুজোর বাইরেও ঐকতান: তবে ঐকতান শুধু তিন দিনের উৎসব নয়, সারা বছরের পরিবার। গ্রীষ্মে আরভাইন রিজিওনাল পার্কে পিকনিক, যেখানে সকালের জলখাবারে কচুরি, আলুর দম আর জিলিপি। শীতের পার্টি, বাংলা নববর্ষের উদযাপন।

খুদেদের জন্য রয়েছে ‘ঐকতান কিডস ক্লাব’, যেখানে ছোটরাই ছোটখাটো অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে শিখছে নেতৃত্বের পাঠ। আর ‘নালন্দা’ নামের উদ্যোগে চলছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ক্লাস।

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাও ভোলেনি ঐকতান। খেলনা ও কম্বল বিতরণ থেকে শুরু করে অরেঞ্জ কাউন্টি ফ্যামিলি জাস্টিস সেন্টার, লরা'স হাউস, জেসি রিস ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছে নানা সেবামূলক কাজ।

আর স্বামী বিবেকানন্দের ‘ফুটবল খেলার’ দর্শন মেনে ক্রিকেট, পিকলবল, হাইকিং তো আছেই। গত তিন বছর ধরে অরেঞ্জ কাউন্টিতে আইপিএল-ধাঁচের একমাত্র ক্রিকেট লিগও আয়োজন করছে তারা।

এবারের পরিকল্পনা, চন্দ্রবিন্দুর সুরে শারদ সন্ধ্যা: এ বছর ঐকতানের পুজো ৯, ১০ ও ১১ অক্টোবর, সেই চেনা ঠিকানায়, টাস্টিনের চিন্ময় মিশনে। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর বোধন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর নৈশভোজ দিয়ে শুরু।

আর শনিবার, ১০ অক্টোবর সন্ধে সাড়ে ছ'টায় মঞ্চে উঠবে বাংলা ব্যান্ডের অন্যতম প্রিয় নাম, চন্দ্রবিন্দু। নব্বইয়ের দশকে যাঁদের গান শুনে বড় হয়েছেন অনেক প্রবাসী বাঙালি, তাঁদের কাছে এ যেন এক টুকরো যৌবন ফিরে পাওয়া।

মণ্ডপে এক টুকরো গ্রাম্য ভারত: তবে এবারের অন্যতম সেরা আকর্ষণ ঐকতানেরই সদস্যদের হাতে গড়া মণ্ডপসজ্জা। ক্যালিফোর্নিয়ার এক হলঘরের দেওয়ালে উঠে আসবে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তের গ্রাম্য শিল্পকলা।

বিহারের মধুবনী, মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি, ওড়িশা ও বাংলার পটচিত্র, কালীঘাটের পট, বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা, ডোকরার ধাতব কারুকাজ, ঝাড়খণ্ডের সোহরাই, মধ্যপ্রদেশের গোন্ড, আর বাংলার কাঁথা স্টিচ। মণ্ডপে পা রাখলেই মনে হবে, যেন ট্রেনের জানলা দিয়ে গোটা দেশটা দেখে নেওয়া।

কাজের ফাঁকে, সপ্তাহান্তের অবসরে সদস্যরা নিজেরাই এই ভাবনাকে রূপ দিয়েছেন। প্রবাসে বড় হওয়া নতুন প্রজন্মের কাছে এ মণ্ডপ শুধু সাজসজ্জা নয়, নিজের শিকড় চেনার এক জীবন্ত পাঠশালা।

শেষকথা: মনে আছে সেই মায়ের কথা, যিনি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ফোনে কলকাতার প্যান্ডেল দেখছিলেন? এই বছর তিনি লালপাড় শাড়ি পরে অঞ্জলির লাইনে দাঁড়াবেন। আর তাঁর ছেলে, যে একদিন ঢাকের বোল চিনত না, সে এবার নিজেই কাঁসর হাতে মেতে উঠবে আরতির তালে।

সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে মা আসেন। কিন্তু মাকে ঘরে আনতে লাগে একটা ঘর, একটা পরিবার। অরেঞ্জ কাউন্টির বাঙালিদের জন্য সেই ঘর-পরিবারের নাম ঐকতান।

ADVERTISEMENT