বাসবী খাঁ ব্যানার্জি
গ্রীষ্মের রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ যখন মনোরম নীল আকাশে পরিণত হয়, সাদা মেঘ নৌকার মতো ভেসে বেড়ায়, বাঙালিরা জেনে যান যে দুর্গাপুজো আমাদের দুয়ারে দাঁড়ায়ে।
বাসবী খাঁ ব্যানার্জি
গ্রীষ্মের রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ যখন মনোরম নীল আকাশে পরিণত হয়, সাদা মেঘ নৌকার মতো ভেসে বেড়ায়, বাঙালিরা জেনে যান যে দুর্গাপুজো আমাদের দুয়ারে দাঁড়ায়ে।
ADVERTISEMENT
সবচেয়ে প্রাচীন, সর্বাপেক্ষা সেলিব্রিটি প্রবাসিনী হলেন মা দুর্গা। দুর্গাপুজো হল মা দুর্গার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বা ঘরে ফেরা। ভগবান শিবের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি বাংলায় পিতৃপুরুষের বাড়ি ছেড়ে কৈলাস পর্বতে স্থায়ী হন। শরৎকালে ছেলেমেয়েদের নিয়ে উনি বাপের বাড়ি আসেন। ওঁর এই ‘ঘরে ফেরা’ কেবল বাংলা এবং ভারতের অন্যত্র নয়, প্রবাসী বাঙালিদের দ্বারাও উদযাপিত হয়, সে পৃথিবীর যেখানেই থাকুক। ইউরোপে জার্মানি, ফ্রান্স,ব্রিটেন অথবা ওদিকে আমেরিকা, কানাডা, বা আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়া যেখানেই হোক,প্রবাসী বাঙালি মা দুর্গাকে সঙ্গে রাখে। তাই এটি কেবল ধর্মীয় উৎসবই নয়। এটি বাঙালির আবেগ, একটি মিলনমেলা। কারও আবার বাড়ির ফেরার উৎসব।
জার্মানিতে সংসার পেতেছি বেশ কিছু বছর। এখানে জীবন বড় ব্যস্ত। কাজে কর্মে কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যায়! কিন্তু সেপ্টেম্বর পার হতেই মেঘের চেহারা এখানেও পাল্টায়। নীল আকাশে অকস্মাৎ সাদা মেঘেরা দেখি ভেসে চলছে, যেমন আজ, সারা আকাশ জুড়ে।
তবে এখানে বলে রাখা দরকার, বার্লিনের দুর্গাপুজো দিয়ে শুধু জার্মানিতেই না, সারা ইউরোপে প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনাও বটে। এর শুরুর গল্পটি ভারী মজার। তখন বেশ কিছু ভারতীয় ‘ভারত মজলিশ’ নামে এক ক্লাবের শুরু করে। প্রতি শুক্রবার বিকেলে চা, মুখরোচক খাবারের সঙ্গে এন্তার গপ্পো ও আড্ডা। এক শুক্রবার নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা যেন সবার মনে কড়া নাড়ল। দুর্গাপুজো এসে গিয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই মন খারাপ। তখন প্রতি বছর দেশে যাবার সামর্থ্য নেই। হঠাৎ একজন বলে উঠল, ‘এখানে শুরু করলেই তো হয়!’ সেই দুর্গাপুজোর শুরু। এখন অবশ্য বেশ ক’টা পুজো হয়। জার্মানির বড় মাঝারি শহরগুলি দুর্গাপুজো উদযাপন করে। দক্ষিণ জার্মানির মিউনিখ থেকে শুরু করে ফ্রাঙ্কফুর্ট, স্টুটগার্ট, ডুসেলডর্ফ, কোলন হয়ে উত্তরে হ্যামবুর্গ, ব্রেমেন এবং রাজধানী বার্লিনে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়। কোলনের পুজো ইউরোপের সবচেয়ে বড়। এখানে কিন্তু পুজো উইকেন্ডে নমো নমো করে নয়। এখানে তিথি অনুযায়ী ঠিক পাঁচ দিনই পুজো হয়।

একটি জার্মান পরিবারে বিবাহিত আমি। আমার স্বামীর পুজোয় আগ্রহ সম্পর্কে অনিশ্চিত ছিলাম। তবে সে আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক প্রমাণিত হয়। উনি বরং আগ্রহী হয়ে নিজের বোনকে জিজ্ঞেস করেন। হঠাৎই একদিন আমার জার্মান ননদিনী ফোন করে ব্রেমেনের পুজোর সংবাদ জানাতে আমার মুখটা যেন হাজারওয়াটের হ্যালজেন বাল্বের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে আমাদের তাঁর শহরের পুজোতে নেমন্তন্ন করছে। এখানেও দুর্গাপুজো হয়? এতো ভাবতেই পারিনি। ননদ আমাদের সে পুজোতে পার্টিসিপেন্ট হিসেবে রেজিস্টারও করে দেয়। বেশ কিছু বাঙালির টেলিফোন নম্বর আমাকে দিয়ে সে ফোন রাখতেই, আমি সেই ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলাম। কি আনন্দ!
তখন জেনে অবাক হলাম যে, বেশ অনেকগুলি পুজো হয় এখানে। যাই হোক, অষ্টমীর সকালে উপবাস রেখে শাড়ি পরে পুজো মণ্ডপে পৌঁছলাম। একটা কমিউনিটি হলে পুজোর আয়োজন। স্টেজের ওপর শোলার তৈরি একচালার ঠাকুর সপরিবারে। নীচে সুন্দর সারি দেওয়া চেয়ারে সবার বসার ব্যবস্থা। ঘরোয়া সুন্দর পুজো, অঞ্জলি, ভোগ সব যথাযথ। আরও ভাল এই যে, অত্যন্ত সুচারু ব্যবস্থাপনা। পুরুষমণ্ডলী রান্নার কাজে ব্যস্ত। কিছু মহিলারাও সাহায্যে আছেন। পুজোর ফল কাটায় আমাকে লাগিয়ে দেওয়া হল। এই সহযোগের সুতোয় আমার ওদের সঙ্গে তৎক্ষনাৎ আত্মীয়তা হল। এই ভালোল গা আমি ভাষায় বোঝাতে পারবো না।
এই বছর ব্রেমেনের পুজোর ৪৫তম বার্ষিকী। আত্মীয় পরিজন ছেড়ে আমরা যারা বিদেশে থাকছি, পুজোর সময়, দোলের সময় আমাদের মন দেশে পরে থাকে। বিদেশে নিজেদের উৎসব পালন করতে পারলে যে কী ভাল লাগার অনুভূতি হয়! ব্রেমেনের এই পুজোতে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, সুইডেন কত দূর দূর থেকে আসা বাঙালি ও অন্য প্রদেশের মানুষের সঙ্গে পরিচয় হল। সত্যি এক মিলন মেলা।
এখন আমি প্রতি বছর জার্মানির বিভিন্ন শহরে পুজো দেখতে যাই। বেশ কয়েক বছর বার্লিনে গিয়েছি। গত দু’বছর হ্যানোভারে ‘অর্পণ’-এর পুজোতে যাচ্ছি। এদের পুজোর শুরু ২০২৪ সালে। এখানে অনেক বাঙালি ও ভারতীয় ছাত্র। পুরোহিত মশাইরা অনেক ক্ষেত্রে দেশ থেকে আসেন। এদের পুজো খুব নিষ্ঠা সহকারে করেন ইউনিভার্সিটির এক ছাত্র। সব নিয়ম হয়তো বিদেশে মানা যায় না। তবে আন্তরিকতার আর আনন্দের কোনও অভাব নেই। সান্ধ্য অনুষ্ঠানে নিজেরাই গান, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, নাটিকা পরিবেশন করে। শুনে এবং দেখে মন ভরে যায়। বেশ লাগে সবার সঙ্গে পুজোর ক’টা দিন আনন্দে কাটাতে।
(লেখিকা: জার্মানিতে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালি )
ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT