আজকাল ওয়েবডেস্ক: “দূর দেশে থেকেও মন যে থাকে বাংলায়, ঢাকের তালে, শিউলির গন্ধে, মায়ের আশীর্বাদে ফিরে আসে আপন ঠিকানায়”।
জার্মানির এসেন শহরে, প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝে, বাঙালির হৃদয়ে এক টুকরো বাংলা গড়ে উঠেছে। তার নাম ‘নিভৃতি’। ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আত্মিক বন্ধনকে আরও গভীর করে তুলতে ইন্ডিয়ান কালচারাল কানেকশন, এসেন ই.ভি.-এর উদ্যোগে এই দুর্গাপুজোর পথচলা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালে। এবার তার তৃতীয় বর্ষ। উৎসবের আঙিনায় নতুন আনন্দ, নতুন স্বপ্ন, আর শিকড়ের কাছে ফিরে আসার এক অমলিন আহ্বান।
কোনও বড় পরিকল্পনার আলোয় নয়, কোনও জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চে নয়, ‘নিভৃতি’র জন্ম হয়েছিল কয়েকজন প্রবাসী বাঙালির একান্ত ড্রয়িংরুমের আড্ডায়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠেছিল কলকাতার পুজোর দিনগুলি। কারও মনে পড়েছিল পাড়ার মণ্ডপ, কারও মনে পড়েছিল ঢাকের আওয়াজ, আবার কারও চোখে ভেসেছিল মায়ের মুখ। সেই ছোট্ট আলোচনাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক বৃহৎ স্বপ্নে। দূর জার্মানির মাটিতে এমন এক দুর্গোৎসব, যেখানে বাঙালিরা একসঙ্গে মিলিত হবে, সংস্কৃতির আলো জ্বালাবে, আর পরবর্তী প্রজন্মকে শোনাবে বাংলার গল্প। সেই স্বপ্নেরই নাম ‘নিভৃতি’।

আজ ‘নিভৃতি’ আর কেবল একটি পুজো নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির মিলনমেলা, বন্ধুত্বের সেতু এবং সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল ঠিকানা। সমগ্র নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়া রাজ্যেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এটি। বখুম, কোলন, ডুসেলডর্ফ, ডর্টমুন্ড, ডুইসবুর্গ, বন, মুনস্টার, আখেন-সহ পার্শ্ববর্তী নানা শহর থেকে বহু মানুষ এই উৎসবের আনন্দে শামিল হতে এসেনের পূজামণ্ডপে উপস্থিত হন। বাঙালিরা যেমন মায়ের আরাধনায় মেতে ওঠেন, তেমনই ভিনদেশি বন্ধু ও নানা সংস্কৃতির মানুষও উপভোগ করেন এই উৎসবের রং, সুর, স্বাদ ও উষ্ণতা। এখানে ভাষা আলাদা হতে পারে, পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু আনন্দের ভাষা এক— উৎসবের ভাষা।
‘নিভৃতি’র প্রথম বর্ষেই সুদূর কুমোরটুলি থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল মায়ের। বাংলার মাটির স্নেহ, শিল্পীর নিপুণ স্পর্শ আর শরতের আগমনী বার্তা বুকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল প্রবাসের উদ্দেশে। কিন্তু নিয়তির অদৃশ্য বিধানে, সেই যাত্রা এসে থমকে দাঁড়ায় বন্দরের দ্বারে। মা আসতে পারেনি। প্রথম বছরের পুজোমণ্ডপ সেজে উঠেছিল তাঁর প্রতীক্ষায়— আলপনার শুভ্র রেখায়, ধূপের ধূসর ধোঁয়ায়, আর ভক্তহৃদয়ের আকুল প্রার্থনায়। বন্দরের অন্তরালে তখনও অপেক্ষায় ছিল কুমোরটুলির মাটির গন্ধ বুকে নিয়ে। তাই প্রথম বর্ষে ছোট্ট প্রতিমা ও ঘট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়েছিল ‘নিভৃতি’র পুজো।

‘নিভৃতি’র পুজোর সূচনায় স্থানীয় মেয়র। নিজস্ব চিত্র।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এসেছিল সেই শুভক্ষণ। গত বছর, নিভৃতির দ্বিতীয় বর্ষে, কুমোরটুলি থেকে আগত সেই প্রতিমাই প্রথমবারের মতো অধিষ্ঠিত হয়েছিল এসেনের পুজোমণ্ডপে। পূর্ণতা পেয়েছিল এক অসম্পূর্ণ আগমন, মুছে গিয়েছিল প্রতীক্ষার বিষাদ। সেদিন প্রবাসের আকাশে যেন বাংলার শরৎ নেমে এসেছিল। কুমোরটুলির মাটির গন্ধ মিশে গিয়েছিল এসেনের বাতাসে, আর মায়ের চরণস্পর্শে দূরদেশের মণ্ডপ হয়ে উঠেছিল আপন বাংলার এক টুকরো উঠোন।
গত বছর ‘নিভৃতি’র উৎসবের সূচনা হয়েছিল স্থানীয় মেয়রের শুভ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। তারপর টানা পাঁচ দিন ধরে চলেছিল আনন্দের জোয়ার। ধূপের গন্ধে, মন্ত্রোচ্চারণে আর ভক্তির আবেশে মুখরিত হয়েছিল পুজোমণ্ডপ। পাশাপাশি ছিল বাঙালির চিরচেনা আতিথেয়তা—সুস্বাদু খাবারের আয়োজন, নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নাচ, আড্ডা আর হাসিতে ভরা অগণিত মুহূর্ত। কেউ এসেছিলেন অঞ্জলি দিতে, কেউ এসেছিলেন ভোগের টানে, কেউ বা শুধু পরিচিত মুখের খোঁজে। কিন্তু ফিরে গিয়েছিলেন সকলেই একরাশ আনন্দ আর আপনজনের উষ্ণতা নিয়ে। পাঁচ দিনের সেই উৎসব যেন বলেছিল—
“দেশ বদলেছে, আকাশ বদলেছে,
তবু মায়ের কাছে ফেরার পথ বদলায়নি।”
২০২৪-এ যে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছিল, আজ তা শিকড় ছড়িয়ে এক প্রাণবন্ত বৃক্ষ। নিভৃতির তৃতীয় বর্ষ তাই শুধু আরেকটি পুজো নয়—এ এক পথচলার উদ্যাপন, প্রবাসে বাঙালিয়ানার জয়গান। এসেনের আকাশে আবার উঠবে ঢাকের বোল, শরতের শুভ্র আলোয়, মায়ের আগমনী সুরে, প্রবাসের প্রতিটি হৃদয় ফিরে পাবে বাংলার আপন ঠিকানা। আর মা দুর্গার আশীর্বাদে ভরে উঠবে সকলের জীবন—শান্তি, ভালোবাসা ও আনন্দের অমলিন আলোয়। এবারের ‘নিভৃতি ২০২৬’-এর উৎসব-আঙিনায় সাজবে সংস্কৃতির এক বর্ণময় আসর। গান, নৃত্য, নাটক আর সৃষ্টিশীল পরিবেশনার ছন্দে মুখর হয়ে উঠবে এসেনের মাটি, জেগে উঠবে প্রবাসে বাংলার প্রাণের স্পন্দন।

কচিকাঁচাদের নাটকে ফুটে উঠবে বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ছোট্ট কণ্ঠে বড় ভাবনা, সরল অভিনয়ে গভীর বার্তা। আর বড়দের নাট্যমঞ্চে ধরা দেবে চিন্তার নতুন দিগন্ত, সৃজনশীলতার অনন্য প্রকাশ ও জীবনের নানা রঙ। সুরের মূর্ছনায়, নৃত্যের ছন্দে, অভিনয়ের আবেগে আর শিল্পের নান্দনিকতায় পাঁচ দিনের উৎসব হয়ে উঠবে আরও প্রাণবন্ত, আরও আপন। প্রতিটি পরিবেশনা যেন বলবে—সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়, সংস্কৃতি আমাদের শিকড়, আমাদের পরিচয়, আমাদের একসূত্রে বাঁধার অদৃশ্য বন্ধন।

উৎসব মানেই শুধু মঞ্চের আলো নয়, উৎসব মানেই একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্পে মেতে ওঠা, পরিচিত স্বাদের কাছে ফিরে যাওয়া। নিভৃতি ২০২৬-এ থাকছে নানা স্বাদের বৈচিত্র্যময় খাবারের আয়োজন। বাঙালির চিরচেনা রসনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্বাদের আকর্ষণীয় পদের সুবাসে ভরে উঠবে উৎসবের প্রাঙ্গণ। এক প্লেট খাবার হয়ে উঠবে বন্ধুত্বের নিমন্ত্রণ, এক কাপ আড্ডা হয়ে উঠবে আপনজনের উষ্ণতা। শিশুর হাসি, বড়দের গল্প, গানের সুর, নাচের তালে আর সুস্বাদু খাবারের আনন্দে—নিভৃতি ২০২৬ সাজবে এক সম্পূর্ণ উৎসবের রূপে।
এখানে মায়ের আরাধনা যেমন ভক্তির, তেমনই উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত ভালবাসার। দূর জার্মানির মাটিতে, বাংলার সংস্কৃতির আলোয়, ‘নিভৃতি ২০২৬’ বাংলার হৃদস্পন্দন আবারও ডাক দেবে সকলকে—
“এসো, মিলি উৎসবের সুরে,
এসো, ফিরি শিকড়ের নীড়ে।”