Loading...

গা ছমছমে নিঝুম রাতে রিনরিনে নুপুরের শব্দ! রঘুনাথগঞ্জের 'এই' মন্দিরে দিনে ভোগ, রাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ

আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিঝুম, নির্জন, গা ছমছমে এক পরিবেশ। চারদিকে ঘন জঙ্গল, দিনের বেলাতেও আলো-আঁধারি খেলা। আর সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই এখানে মায়ের বাস। তবুও মা যেন জীবন্ত! কোনও ভক্তের কথাই ফেলতে পারেন না তিনি।

মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জ শহরের অদূরে, সিদ্ধিকালী এবং বিপ্রকালী গ্রামের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত মা সিদ্ধেশ্বরী কালীর মন্দির এমনই জাগ্রত যে, কোনও ভক্তই তাঁর কাছ থেকে খালি হাতে ফেরেন না। কিন্তু একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও আজও তাঁর অস্তিত্ব রহস্যে মোড়া। তবে আসন্ন দীপান্বিতা কালীপুজো উপলক্ষে আলোকমালাই সেজে উঠছে এই মন্দির ।

ADVERTISEMENT

লোককথা অনুযায়ী, এই মন্দির প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এবং রানী ভবানীর হাতে নির্মিত। শোনা যায়, রানী ভবানীকে স্বয়ং মা সিদ্ধেশ্বরী স্বপ্নে দেখা দিয়ে এই গ্রামে তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠার আদেশ দেন। সেই স্বপ্নাদেশ পেয়েই রানী ভবানী কালো কষ্টিপাথরের মূর্তি তৈরি করে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং মন্দির নির্মাণ করেন ।

আরও পড়ুন

কিন্তু ইতিহাসের সেই পবিত্র মূর্তিকে ঘিরেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। কয়েক দশক আগে কষ্টিপাথরের এই মূর্তি চুরি হয়ে যায়। আর তখনই, সম্ভবত মায়ের কোপেই, সমগ্র মন্দির চত্বর কিছুটা ভূগর্ভে ঢুকে যায়। গ্রামবাসীরা ভয়ে শিহরিত হয়ে ওঠেন। তারপর গ্রামবাসীরা সম্মিলিতভাবে সেই মন্দিরকে আবারও পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। আর অলৌকিকভাবে, এর পরই উদ্ধার হয় সেই চুরি যাওয়া মায়ের মূর্তি। সেই থেকেই এই মন্দিরের জাগ্রত রূপ নিয়ে বিশ্বাস আরও গাঢ় হয়েছে।

গ্রামবাসীদের মতে, এই মন্দিরের নাম অনুসারেই গ্রামের নাম হয়েছে সিদ্ধিকালী। 'সিদ্ধি' মানে যেখানে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। স্থানীয়দের অগাধ বিশ্বাস, এখানে মায়ের কাছে কিছু চাইলে তা কখনও বিফলে যায় না। আবার অন্যদিকে মা এখানে সিদ্ধেশ্বরী কালী রূপে পূজিতা হন।

মা কালীর মূর্তি এখানে কালো কষ্টিপাথরের, তার ওপর লাল-হলুদ ফুলের সাজে সজ্জিত। মায়ের চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি যেন সব দেখছেন। মন্দির চত্বরেই রয়েছে একটি জাগ্রত বটগাছ এবং তার পাশে একটি শিব মন্দির। বটগাছটিকে ঘিরেও রয়েছে নানা বিশ্বাস।

সিদ্ধিকালী মন্দিরের ট্রাস্টের এক সদস্য মানবেন্দ্র মুখার্জি বলেন, "মা এখানে খুবই জাগ্রত। তাঁর কাছে কেউ ভক্তি ভরে মানত করলে তা বিফল হয় না। আমাদের এখানে মন্দিরের দু'জন সেবায়েত রয়েছেন। ৬ মাস পালা করে তারা পুজো দেন।"

তিনি আরও বলেন, "বছরের আটটি বড় পার্বন ছাড়াও ৩৬৫ দিনই আমাদের এখানে মাকে অন্নভোগ দেওয়ার রীতি রয়েছে। তবে পুরোটাই দিনের বেলা। কারণ রাতের অন্ধকারে পার্বন ছাড়া ওই অঞ্চলে কেউই যেতে চান না।"

এটাই এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় রহস্য। বছরে ৮টি বড় উৎসব এখানে ধুমধাম সহকারে পালিত হয় । কালীপুজো, দীপান্বিতা অমাবস্যা, ফলহারিণী, রটন্তী সহ বিভিন্ন তিথিতে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয় এখানে । বলি প্রথারও ব্যবস্থা রয়েছে প্রাচীন রীতি মেনে। কোনও বড় পুজোয় বলি হলে, তার পরের দিন জনসাধারণের জন্য ভোগের ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু পুজো শেষ হলেই মন্দির চত্বর আবার নির্জন। গ্রামবাসীরা আজও বিশ্বাস করেন, রাতের বেলা ওই মন্দিরে মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। নিঃশব্দ, নিঝুম পরিবেশে অনেকেই নূপুরের আওয়াজ শোনেন। কেউ কেউ বলেন, রাতে মা নাকি মন্দির চত্বরে বিচরণ করেন। তাই আজও সূর্য ডোবার পর এই মন্দির চত্বরে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। কেউ ভুলেও ওমুখো হন না।

সব মিলিয়ে রঘুনাথগঞ্জের সিদ্ধিকালী মায়ের মন্দির অলৌকিকতা, রহস্য এবং বিশ্বাসের এক অনন্য মিশেল হিসেবে রঘুনাথগঞ্জ তথা সমগ্র মুর্শিদাবাদবাসীর কাছে পরিচিত। যেখানে ভক্তি আর ভয়, বিশ্বাস আর রহস্য একই সঙ্গে মিশে থাকে।

ADVERTISEMENT