আজকাল ওয়েবডেস্ক: শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের মেলবন্ধনের এক অনন্য ইতিহাস বহন করে চলেছে নদিয়ার শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালীপুজো। প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার ইতিহাস, তন্ত্রসাধনা এবং দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির কাহিনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে এই পুজো। আজও প্রাচীন রীতিনীতি মেনেই আরাধনা করা হয় মা আগমেশ্বরীর।
শাক্ত ও বৈষ্ণবের মেলবন্ধনের অনন্য নিদর্শন, প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালীপুজো
ADVERTISEMENT
কথিত আছে, পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের প্রপৌত্র সার্বভৌম আগমবাগীশ এই পুজোর সূচনা করেন। তন্ত্রসাধক সার্বভৌম আগমবাগীশের সঙ্গে অদ্বৈতাচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামীর কন্যার বিবাহ হয়েছিল। সেই সময় শাক্ত ও বৈষ্ণবদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এই বিবাহ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির সেতু তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে মথুরেশ গোস্বামী জামাতা ও কন্যাকে নিয়ে শান্তিপুরে চলে আসেন। জামাতার সাধনার জন্য বসতবাড়ি থেকে কিছুটা দূরে তৈরি করে দেন পঞ্চমুণ্ডির আসন। সেখানেই সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন সার্বভৌম আগমবাগীশ।
আরও পড়ুন
লোককথা অনুযায়ী, দেবীর নির্দেশে গঙ্গার মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে পুজো শুরু করেন তিনি। পুজো শেষে প্রতিমা বিসর্জনও দেওয়া হত। সেই প্রাচীন রীতি আজও বজায় রয়েছে। পঞ্চমুণ্ডির আসন সংলগ্ন এলাকাটি বর্তমানে আগমেশ্বরীতলা নামে পরিচিত। বড় গোস্বামী পরিবারের সদস্যরাই বংশপরম্পরায় এই পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
প্রাচীন রীতি মেনেই হয় পুজোর আয়োজন
বিজয়াদশমীর দিন মায়ের পাটে সিঁদুর দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পরবর্তী বছরের পুজোর প্রস্তুতি। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী পাটখিলান। এরপর শুরু হয় প্রায় ১৮ ফুট উচ্চতার বিশাল প্রতিমা তৈরির কাজ। কালীপুজোর দিন প্রতিমার রং সম্পূর্ণ হওয়ার পর গভীর রাতে হয় চক্ষুদান। রাত ৯টা নাগাদ পরিবারের সদস্যরা দেবীকে অলংকারে সাজিয়ে তোলেন। উপবাসে থেকে শুদ্ধবস্ত্রে মৃৎশিল্পী দেবীর চক্ষুদান করেন। এরপর পরিবারের বংশধরের হাতে মাকে সিঁদুর পরানো হয়। রাত ১১টা থেকে শুরু হয় তন্ত্রমতে পুজো, যা শেষ হয় পরদিন ভোরে। বর্তমানে বংশপরম্পরায় পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন পুরোহিত রঘুনাথ ভট্টাচার্য।
৩৬ রকম নিরামিষ পদে মায়ের ভোগ
আগমেশ্বরী মায়ের ভোগেও রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দেবীকে নিবেদন করা হয় ৩৬ রকমের নিরামিষ ব্যঞ্জন। এখানে পশুবলির কোনও প্রথা নেই। তার পরিবর্তে আখ ও চালকুমড়ো বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে। শাক, বিভিন্ন ডাল, শুক্তনি, ছানার ডালনা, এঁচোড়, পোলাও, চাটনি, মিষ্টান্ন ও মরশুমি ফল দিয়ে সাজানো হয় ভোগের থালা। গোস্বামী পরিবারের দীক্ষিত মহিলারাই নিষ্ঠার সঙ্গে এই ভোগ রান্না করেন।
পুজোর পরদিন ভক্তদের জন্য আয়োজন করা হয় বিশাল মহাভোগের। প্রায় ১৪ কুইন্টাল গোবিন্দভোগ চাল, দেড় কুইন্টাল ঘি, এক কুইন্টাল কাজু, এক কুইন্টাল কিশমিশ এবং ১৪ কেজি গরমমসলা দিয়ে তৈরি হয় পোলাও। সঙ্গে থাকে সমপরিমাণ আলুর দম ও পায়েস। নবদ্বীপের একটি গোস্বামী আশ্রমের প্রতিনিধিরা এই মহাভোগ রান্নার দায়িত্ব পালন করেন।
পুজোর পরদিনই মহাসমারোহে বের হয় বিসর্জনের শোভাযাত্রা। আগে কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার রীতি থাকলেও বর্তমানে ট্রলারে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় মতিগঞ্জ ঘাটে। সেখানেই সম্পন্ন হয় বিসর্জন।
সব মিলিয়ে শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালীপুজো কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, প্রায় চার শতাব্দীর ইতিহাস, তন্ত্রসাধনা এবং শাক্ত-বৈষ্ণব সম্প্রীতির এক জীবন্ত ঐতিহ্য। সময়ের পরিবর্তন হলেও প্রাচীন আচার ও পারিবারিক নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আজও অমলিন এই পুজোর মাহাত্ম্য।
ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT
সবাই যা পড়ছেন
ADVERTISEMENT