আজকাল ওয়েবডেস্ক: তেজগঞ্জের বিদ্যাসুন্দর কালীবাড়ি ঘিরে রয়েছে মধ্যযুগের এক উপকথা। মঙ্গলকাব্য আর ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ একাধিক কাব্যে উল্লেখ। টেরাকোটার অনুপম কারুকাজ নিয়ে এই মন্দির আজও অবহেলিত। পুজারী পরিবার বুক দিয়ে আগলে রেখেছে বাংলার এই সম্পদ।
কার্তিক আমাবস্যার রাতে আলোর রোশনাইয়ে ভাসে গোটা বাংলা। তবে ওই দিনই নিভৃতে পূজিত হয় বর্ধমানের উপকন্ঠে তেজগঞ্জের ‘বিদ্যাসুন্দর কালী’।
জন কোলাহল, আলোর রোশনাই, বিভিন্ন বাদ্যির শব্দ এসব থেকে কার্যত যেন অন্তরালেই থাকে ভরতচন্দ্রের এই বিদ্যাসুন্দর কালী। তেজগঞ্জের নির্জন নির্ভৃত স্থানে পাষান মূর্তি বিদ্যাসুন্দর কালী অবস্থান করলেও তার প্রতি বর্ধমানবাসীর ভক্তিভাবে বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে নি। নিত্যদিন পুজোপাঠ ও সন্ধ্যা আরতি হয়।
বিদ্যাসুন্দর কালীর পুজো নিয়ে নানা কাহিনি প্রচলিত আছে। রায়গুনাকার ভারতচন্দ্রের কাব্যগ্রন্থেও উল্লেখিত রয়েছে বিদ্যাসুন্দর কালীর কথা। কথিত আছে, একদা দামোদর তীরবর্তী তেজগঞ্জে ছিল জঙ্গল আবৃত। সেখানে ছিল এক প্রাচীন কালী মন্দির। সেই সময়, বর্ধমানের রাজারা ওই মন্দিরে পুজো দিতে আসতেন। এও শোনা যায় ওই সময়ে এই মন্দিরে নরবলি হত। শোনা যায় যে মন্দিরের আশেপাশে সুড়ঙ্গও ছিল। তবে সেই সুড়ঙ্গ কোথায় ছিল তা অবশ্য আজ আর কেউ বলতে পারেন না। তবে ওই সুড়ঙ্গের সঙ্গে আজও জড়িয়ে রয়েছে এক প্রেম কাহিনি।
কথিত আছে, ওই সূড়ঙ্গ দিয়েই তখনকার রাজকন্যা বিদ্যার সঙ্গে গোপনে দেখা করতেন সুন্দর। সুন্দর ছিলেন দক্ষিণ মশান কালীর গরিব পুজারীর সন্তান। রাজবাড়ি থেকে মন্দিরে পুজোর ফুল দিতে আসতেন মালিনীর মাসি। একদিন সুন্দর তার কাছে সুন্দর একটি মালা দেখতে পান। তিনি মালিনী মাসির কাছে জানতে পারেন মালাটি নাকি গেঁথেছে রাজকন্যা বিদ্যা। সুন্দর এর পরেই রাজকন্যার সঙ্গে দেখা করার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলে বিদ্যা সেদিন ভয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু পালিয়ে গেলে কী হবে?
সুন্দরের মন উদগ্রীব হয়ে ওঠে বিদ্যার জন্যে। ধরা পড়লে একেবারে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সুন্দর রাজবাড়ি অবধি সূড়ঙ্গ কেটে ফেলে। সুড়ঙ্গ পথ ধরেই সুন্দর রাজকন্যা বিদ্যার কাছে পৌঁছে যায়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গভীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরী হয় বিদ্যা আর সুন্দরের মধ্যে। বিদ্যা আর সুন্দরের প্রণয় সম্পর্কে আবদ্ধ হবার কথা রাজার কানে পৌঁছে দেন কয়েকজন। একথা জানার পরেই রাজা তেজগঞ্জের মন্দিরেই কালীর সামনে নিজের মেয়ে আর তাঁর প্রেমিককে বলির নির্দেশ দেন। হাঁড়িকাঠে তাদের দু’জনকে বলি দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মূর্তি প্রণামের অনুরোধ করেন সুন্দর। তখনই মূর্ছিত হন কাপালিক। মূহুর্তেই গায়েব হয়ে যান বিদ্যা আর সুন্দর। তার পর থেকে তাঁদের আর কোন খোঁজ মেলেনি। এরপর থেকে রাজার আদেশে মন্দিরে নরবলি বন্ধ হয়ে যায়। ভারতচন্দ্র সহ নানা রচয়িতার কাব্যে বিভিন্ন সময়ে একাধিক তথ্য পাওয়া গিয়েছে। যদিও লোককাহিনি আবার একটু ভিন্নসুরে কথা বলে।
ভারতচন্দ্রের সেই বিদ্যাসুন্দর কালী আজও রয়েছে বর্ধমানের তেজগঞ্জে। এখানে এখনও রয়েছে সেই মূর্তি। আর রয়েছে ভৈরব আর পঞ্চানন্দ এই দুই মন্দির। শোনা যায়, রাজনির্দেশে বাঁকুড়া থেকে এসে এই মন্দিরে পুজোর ভার পেয়েছিলেন বর্তমান সেবায়েত বংশের পূর্বপুরুষ।
একসময় এখানকার ভোগের প্রসাদ খেয়ে অনেকেই বেঁচে থাকতেন। সেই জাঁকজমক আজ আর নেই। তবুও শ্যামাপুজোর দিন এই মন্দিরে নিষ্ঠা সহকারে পুজো হয়। পুজো শেষ হলে পুনরায় নির্জনেই থেকে যায় বিদ্যা সুন্দর কালী।