আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিসর্জনের শোভাযাত্রা বের করতেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন একদল যুবক। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল ফৌজদারি মামলা। আদালতে হয়েছিল বিচারও। আর সেই মামলায় সাক্ষী নাকি স্বয়ং মা কালী! শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে মুক্তি পেয়েছিলেন অভিযুক্তরা। ব্রিটিশ আমলের সেই প্রতিবাদ, মামলা এবং জনশ্রুতিকে ঘিরেই আজও বর্ধমান শহরে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে ‘ফৌজদারি কালী’ এবং তাঁর বিসর্জনের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।
বর্ধমান শহরের খোসবাগান এলাকার রাজরাজেশ্বর শিবতলায় অবস্থিত এই কালীমন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের আইন অমান্য, প্রতিবাদ এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কাহিনি। প্রায় ৮৮ বছরের পুরনো এই ইতিহাস আজও স্থানীয় মানুষের আবেগের সঙ্গে মিশে রয়েছে।
একসময় এই দেবী ‘বাগদী পাড়ার কালী’ নামেই পরিচিত ছিলেন। বাংলা ১৩৪৫ সাল অর্থাৎ ১৯৩৮ সালের আগে রাজরাজেশ্বর শিবমন্দির সংলগ্ন এলাকায় রাজার অনুমতি ছাড়া স্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করা সম্ভব ছিল না। তাই একটি কুলগাছের নীচে তালপাতার অস্থায়ী ছাউনি তৈরি করেই পুজোর আয়োজন করতেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গৌরী ঠাকুর, নরেন ঠাকুর, অবিনাশ মাঝি, সনাতন মাঝি ও দুখীরাম পরামানিক-সহ কয়েকজনের উদ্যোগে মাত্র চার আনা করে চাঁদা তুলে শুরু হয়েছিল এই পুজো। পরে নারায়ণবাবুর পুত্র শম্ভু ঘোষ মন্দিরের বেদিটি পাকা করে দেন।
কিন্তু এই পুজোকে ইতিহাসের পাতায় বিশেষ জায়গা করে দিয়েছে বিসর্জনের একটি ঘটনা। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় একটি আইনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। সেই আইন অনুযায়ী, অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনাগৃহের সামনে দিয়ে হিন্দু দেবদেবীর বিসর্জনের শোভাযাত্রা বা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
বর্ধমানের কৃষ্ণসায়র, শ্যামসায়র কিংবা রাণীসায়রে প্রতিমা নিরঞ্জন করতে গেলে কয়েকটি উপাসনাগৃহের সামনে দিয়ে যাওয়া কার্যত অনিবার্য ছিল। এমনকি উপাসনাগৃহের ১০০ গজের মধ্যে বাদ্যযন্ত্র না বাজিয়ে নীরবে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার আবেদনও নাকচ হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরব হন শহরের একাংশের বিশিষ্ট মানুষ।
শহরের আইনজীবী গিরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে একটি গোপন বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলাই মুখোপাধ্যায়, শ্রীকুমার মিত্র, রাজকৃষ্ণ দত্ত, প্রণবেশ্বর সরকার, প্রণব কুমার সান্যাল, প্রাণদা মুখোপাধ্যায় এবং যতীন্দ্রনাথ বিষ্ণু-সহ আরও অনেকে।
বাড়ির পুজোর প্রতিমা নিয়ে আইন অমান্য করলে বাড়ির মালিককেই সরাসরি আইনি শাস্তির মুখে পড়তে হত। তাই যতীন্দ্রনাথ বিষ্ণুর প্রস্তাব অনুযায়ী, বাগদী পাড়ার বারোয়ারি কালীপ্রতিমাকে সামনে রেখেই আইন অমান্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ৩০ কার্তিক রাত ৮টা। মাত্র একটি ঢোল ও কাঁসি বাজিয়ে শুরু হয় বিসর্জনের শোভাযাত্রা। খোসবাগান পাড়ার কিশোর তিনকড়ি মুখোপাধ্যায়ের মাথায় চাপানো হয়েছিল প্রতিমা। শহর পরিক্রমার পথে সাধারণ মানুষও হ্যাজাক, কাঁসর ও ঘণ্টা নিয়ে মিছিলে যোগ দেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদে শামিল হন বর্ধমানের বাসিন্দারা।
তৎকালীন বর্ধমান থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক মহম্মদ বাবর আলির কড়া নিরাপত্তায় শোভাযাত্রা ও বিসর্জন সম্পন্ন হয়। কিন্তু বিসর্জনের পরই শুরু হয় আইনি পদক্ষেপ। আইন অমান্যের অভিযোগে কয়েকজন যুবককে গ্রেপ্তার করে তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। বর্ধমান আদালতে তাঁদের ছ’মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার সাজা হয়।
এরপর কলকাতা হাইকোর্টে আপিল করা হয়। তৎকালীন কয়েকজন ব্যারিস্টার বিনা পারিশ্রমিকে অভিযুক্তদের হয়ে মামলা লড়েন। শেষ পর্যন্ত সকলেই সসম্মানে মুক্তি পান এবং বিসর্জনের শোভাযাত্রা বের করার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, আদালতের সেই মামলায় মা কালী স্বয়ং সাক্ষী দিয়ে তাঁর সন্তানদের মুক্ত করে এনেছিলেন। ফৌজদারি মামলায় জয় এবং ভক্তদের রক্ষা করার সেই বিশ্বাস থেকেই ‘বাগদী পাড়ার কালী’ পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ফৌজদারি কালী’ নামে।
সেই ঘটনার স্মৃতি আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একসময় মাকে কাঁধে ও মাথায় করে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই ঐতিহ্য মেনেই আজও চতুর্দোলায় চাপিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে মায়ের নিরঞ্জন হয়। পুজোর থেকে বিসর্জনের শোভাযাত্রার আকর্ষণ কোনও অংশে কম নয়। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ এই শোভাযাত্রা দেখতে ভিড় করেন।
পুজো কমিটির সহ-সভাপতি অচিন্ত্যাভ ভট্টাচার্য এবং স্থানীয় বাসিন্দা সহেলী পালদের কথায়, আজও পুরনো রীতি ও নিষ্ঠা মেনেই পুজোর আয়োজন করা হয়। রয়েছে বলিপ্রথা, দণ্ডি কাটা, ধুনো পোড়ানো এবং অন্নকূট ভোগের ব্যবস্থা। কালীপুজোর দিন দুপুরে পাড়ার মহিলারা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে শোভাযাত্রা করে মাকে মণ্ডপে নিয়ে আসেন। তিন দিন মন্দিরে থাকেন দেবী। নিয়ম অনুযায়ী, ভাইফোঁটার পরের দিন মায়ের বিসর্জন হয়। তবে সেই দিন বৃহস্পতিবার পড়লে পরের দিন নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা বের করা হয়। পাশাপাশি আয়োজন করা হয় জলসারও।