Loading...

বন্যপ্রাণীর ভয় পেরিয়ে উৎসবের টানে একজোট গ্রাম, খট্টিমারির জনকল্যাণ ক্লাবের পুজোয় মিলনের বার্তা

আজকাল ওয়েবডেস্ক: জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত জঙ্গল ঘেরা গ্রাম খট্টিমারি। চারপাশে বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণীর উপদ্রব আর প্রতিকূলতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই দিন কাটে এখানকার মানুষের। সন্ধ্যা নামলেই বন্য প্রাণীর ভয়ে তিনটি বন বস্তির রাভা, নেপালি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের বহু মানুষ নিজেদের গ্রাম ছেড়ে বাইরে বেরোতে ভয় পান। সেই পরিস্থিতিতে ধূপগুড়ি শহরের বড় বাজেটের দুর্গাপুজো দেখা তাঁদের অনেকের কাছেই যেন অধরা স্বপ্ন। কিন্তু সেই আক্ষেপ অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছে খট্টিমারি সাপ্তাহিক বাজারের উপর দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে আয়োজিত জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগারের দুর্গাপুজো।

এখানে নেই শহরের নামী পুজো গুলির মতো বিশাল মণ্ডপ, চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা কিংবা প্রতিমায় বড় কোনও চমক। তবুও এই পুজোর আকর্ষণ অন্য জায়গায়। বছরের পর বছর ধরে এই দুর্গোৎসবই হয়ে উঠেছে খট্টিমারি এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন ক্ষেত্র। উৎসবের কয়েকটি দিন জাতি, সম্প্রদায় ও ভৌগোলিক দূরত্ব ভুলে একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ।

ADVERTISEMENT

একসময় গোটা গ্রামে চাঁদা সংগ্রহ করেই পুজোর আয়োজন করা হতো। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারি আর্থিক সহায়তা পাওয়ায় পুজোর আয়োজন অনেকটাই স্বচ্ছন্দ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ। গ্রামের মানুষের সহযোগিতা, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশে থাকা এবং ক্লাব সদস্যদের উদ্যোগেই বছরের পর বছর ধরে এগিয়ে চলেছে এই পুজো।

আরও পড়ুন

প্রতিবছর ষষ্ঠীর দিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূর থেকে প্রতিমা নিয়ে আসা হয় খট্টিমারিতে। প্রতিমা গ্রামে পৌঁছনোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই কচিকাঁচা থেকে শুরু করে বয়স্ক গ্রামবাসীদের মধ্যে তৈরি হয় উৎসাহ। পুজোর প্রস্তুতি ঘিরে বাজার চত্বরেও বাড়তে থাকে ব্যস্ততা। তবে ষষ্ঠীর দিন প্রতিমা এলেও মায়ের মুখ দর্শনের জন্য ভক্তদের অপেক্ষা করতে হয়। সপ্তমী থেকেই শুরু হয় পুজোর মূল পর্ব।

অষ্টমীর সকালে পুষ্পাঞ্জলি দিতে বিভিন্ন গ্রাম থেকে অসংখ্য ভক্তের সমাগম ঘটে জনকল্যাণ ক্লাবের পুজো মণ্ডপে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে এই পুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার পালনের উপলক্ষ নয়, বরং আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হওয়া, কুশল বিনিময় এবং একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ারও বিশেষ সময়।

দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগারের বিশেষ উদ্যোগে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় গোটা বাজার চত্বরে আয়োজন করা হয় টানা সাত দিনব্যাপী আনন্দ মেলার। এই মেলায় দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতা ও বিক্রেতারা এসে ভিড় জমান। বিভিন্ন ধরনের দোকান, কেনাকাটা এবং উৎসবের পরিবেশে জমজমাট হয়ে ওঠে খট্টিমারি সাপ্তাহিক বাজার। পুজো ও মেলাকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও বাড়তি উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পসরা নিয়ে বসা বিক্রেতারা এই কয়েকটি দিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ফলে জনকল্যাণ ক্লাবের দুর্গাপুজো ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রত্যন্ত বনাঞ্চল লাগোয়া এলাকার মানুষের কাছে দুর্গাপুজোর আনন্দ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে খট্টিমারির জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগারের ভূমিকা তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শহরের জাঁকজমক না থাকলেও মানুষের আন্তরিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উৎসবের প্রতি ভালোবাসাই এই পুজোর মূল শক্তি।

ক্লাব কর্তৃপক্ষের আশা, বিগত বছর গুলির মতো এবারও পুজো দেখতে এবং আনন্দ মেলায় অংশ নিতে প্রচুর মানুষের সমাগম হবে। একদিকে মায়ের আরাধনা, অন্যদিকে সাত দিনব্যাপী মেলা সব মিলিয়ে খট্টিমারিতে দুর্গোৎসব ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। বড় বাজেটের পুজোর ভিড়ে খট্টিমারির এই আয়োজন যেন মনে করিয়ে দেয়, দুর্গা পুজোর আসল আনন্দ শুধু আলোকসজ্জা কিংবা মণ্ডপের জাঁক জমকে নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনে। বন্য প্রাণীর ভয় আর প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেও তাই ৩৭ বছর ধরে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা ছড়িয়ে চলেছে জনকল্যাণ ক্লাব ও পাঠাগারের দুর্গাপুজো।

ADVERTISEMENT