আজকাল ওয়েবডেস্ক: হিন্দু ধর্মে মা কালী হলেন সৃষ্টি, স্থিতি, মৃত্যু ও ধ্বংসের প্রতীক। শাস্ত্রমতে ‘কালী’ শব্দটির উৎস ‘কাল’ অর্থাৎ সময়, অথবা কালো বা অন্ধকার। তাই তিনি ঘোর কালো বর্ণের হলেও তিনিই সময়ের নিয়ন্ত্রক। আবার তন্ত্রশাস্ত্র মতে তিনি দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী।
কিন্তু হিন্দু দেবী হলেও মুর্শিদাবাদের সুতির আলমপুর রাজবংশী পাড়ার শ্রী শ্রী শ্মশান কালী জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই আরাধ্য দেবী। এখানে ভক্তি ও বিশ্বাসের কাছে হার মেনেছে ধর্ম। তাই কালীপুজো উপলক্ষে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও আসেন মায়ের কাছে তাঁদের প্রার্থনা জানাতে।
মন্দির চত্বরে গেলেই চোখে পড়বে এক অনন্য ছবি। হিন্দু ভক্তরা যেমন ফুল, মিষ্টি, সিঁদুর দিয়ে মানত করেন, তেমনই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন তাঁদের রীতি মেনে ইচ্ছাপূরণের আশায় মন্দির চত্বরে মুরগি, হাঁস ছেড়ে দেন। কারও অসুখ সারানো, কারও সন্তান লাভ, কারও ব্যবসায় উন্নতি, মায়ের কাছে মনের কথা জানাতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন সকলে।
১৯৫৩ সালে বারালা গ্রামের গোপাল ঠাকুরের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজবংশী পাড়ার এই শ্মশান কালী। তিনি বারালার কালীকূপ থেকে নিশিরাতে এই কালী মূর্তি নিয়ে এসে আলমপুরের রাজবংশী পাড়া শ্মশানে মাকে প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর সেখানেই তিনি সাধনা করতেন।
পরবর্তীকালে আলমপুর রাজবংশী পাড়ার শ্রীপতি সরকার এই পুজোর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু এখনও গোপাল ঠাকুরের বংশধররাই এই পুজোয় পৌরহিত্য করে থাকেন। শতাব্দী প্রাচীন এই পরম্পরা আজও অটুট।
রাজবংশী বংশের বর্তমান প্রজন্ম চিত্ত সরকার বলেন, “আমাদের গ্রামের মানুষজনের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করেই আমরা এই মন্দির নির্মাণ করেছি। কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় এখানে ধুমধাম সহকারে পুজো করা হয়। নিশিরাতে আমাদের এই শ্মশান কালীর পুজো হয় এবং পরের দিন ১৪-১৫ হাজার মানুষকে ভোগ খাওয়ানোর ব্যবস্থা থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রত্যেক বছর কালীপুজো উপলক্ষে মন্দিরের মধ্যেই প্রতিমা তৈরি করা হয়। পুজোর চার দিন পর সেই প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের মা এখানে খুবই জাগ্রত। তাই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই আসেন মায়ের কাছে মানত করতে। আর মায়ের কাছে মানত করলে তা কখনও বিফলে যায় না।”
দীপান্বিতা অমাবস্যায় শুধুমাত্র শ্মশান কালীর মূর্তি নির্মাণ করা হয় তা নয়, শ্মশানের মধ্যে তৈরি হয় তারকা রাক্ষসী এবং বামদেবের মূর্তিও। সব মিলিয়ে জাঁকজমক সহকারে চার দিন ধরে চলে আলমপুর রাজবংশী পাড়ার শ্রী শ্রী শ্মশান কালী মন্দিরের কালীপুজো।
কালীপুজোর চার দিন গোটা গ্রাম যেন উৎসবের চেহারা নেয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের ভিড়ে ভরে ওঠে মন্দির চত্বর। রাতে পুজো, দিনে ভোগ বিতরণ, সব মিলিয়ে এক মিলনমেলা।
গ্রামবাসীদের কথায়, এই শ্মশান কালীর পুজোয় এখনও ১৪-১৫ হাজার মানুষকে ভোগ বিতরণ করা হয়। হিন্দুদের কাছে তিনি যেমন জাগ্রত দেবী, মুসলিমদের কাছেও তিনি ইচ্ছাপূরণের দেবী।
এই মন্দির তাই শুধু একটি উপাসনাস্থল নয়, এটি সম্প্রীতির প্রতীক। যেখানে ধর্মের বিভেদ মুছে গিয়ে মানুষ মিশে যায় একটিই পরিচয়ে, তা হল ভক্ত। আলমপুরের শ্মশান কালী আজও সেই বার্তাই বয়ে নিয়ে চলেছেন, ভক্তির কাছে ধর্মের কোনও ভেদাভেদ নেই।