আজকাল ওয়েবডেস্ক: নবাবের জেলা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারদুয়ারি, মতিঝিল, কাঠগোলা বাগানের মন্দিরের ছবি। কিন্তু এই নবাবী জৌলুসের আড়ালেই মুর্শিদাবাদের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে বাঙালির সাবেকিয়ানা, পরম্পরা আর ঐতিহ্য। আর সেই ঐতিহ্যেরই সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন হল জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো। সার্বজনীন পুজোর থিমের চমকের মধ্যে এখানে জাঁকজমক বা বিশাল আরম্বরের আতিশয্য না থাকলেও আছে সাবেকিআনা, আচার-নিষ্ঠা এবং এক অলৌকিক বিশ্বাস। এরকমই এক আড়ম্বর বর্জিত কিন্তু ইতিহাসে মোড়া সাবেকি পুজো হল জঙ্গিপুরের সাহেব বাজারের ঘোষাল বাড়ির দুর্গাপুজো।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৪০০ -৪৫০ বছর আগে এই পুজোর সূচনা হয়। কথিত আছে, গয়ামনি গোস্বামী নামে পরিবারের এক সদস্য স্বপ্নাদেশে ঘাটের ধারে মা দুর্গাকে দেখতে পান। দেবীর নির্দেশেই শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক পুজো। প্রথমে এই পুজো গোস্বামী বাড়িতেই হত। পরবর্তীকালে পরিবারের এক শরিকের সূত্রে শ্বশুরবাড়ির তরফে এই পুজোর দায়িত্ব চলে আসে ঘোষাল পরিবারের হাতে। এরপর মহাদেব প্রসাদ ঘোষাল এই পুজোর প্রচলন শুরু করেন ঘোষাল বাড়িতে। বর্তমানে তাঁর পুত্র সুকুমার ঘোষালের ছেলে গৌতম ঘোষাল এবং তাঁর ভাইয়েরা বংশ পরম্পরায় এই পুজোর দায়িত্ব সামলে আসছেন।
এই পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল প্রজাপতির আগমন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, পুজো শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই দেবীর থানের আশেপাশে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতির আনাগোনা শুরু হয়। বিশেষ করে সন্ধিপুজোর সময় মায়ের থানে প্রজাপতি আসবেই। এর কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজও খুঁজে পাননি পরিবারের সদস্যরা বা এলাকাবাসী। তাঁরা একে দেবীর মাহাত্ম্য বলেই মনে করেন।
শুধু তাই নয়, ঘোষাল বাড়ির পুজোর আরেকটি অনন্য রীতি হল, এখানে মা দুর্গা থাকেন লোহার শিকলে বাঁধা অবস্থায়। এর পেছনেও রয়েছে এক জনশ্রুতি। কথিত আছে, পরিবারের কোনও এক সদস্য একবার রাতে দেবী দুর্গাকে নিজের থান থেকে নেমে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলেন। তারপর থেকেই মা যাতে আর পুজোর সময় বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে না পারেন, সেই প্রাচীন রীতি মেনে আজও মাকে পেছন থেকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এই রীতি আজও নিষ্ঠা ভরে পালন করা হয়।
ঘোষাল পরিবারের পুত্রবধূ রিম্পা ঘোষাল বলেন, "প্রাচীন রীতি মেনে আজও আমরা পরিবারের সকলে মিলে একসঙ্গে মা দুর্গার আরাধনা করি। আমাদের পুজো অন্য বাড়ির থেকে অনেকটাই আলাদা। দুর্গা নবমীর ঠিক ১৫ দিন আগে যে নবমী, অর্থাৎ 'বোধ নবমী'তে আমাদের মায়ের বোধন হয়। সেদিন থেকেই আমাদের বাড়িতে গীতা পাঠ এবং পুজোর আয়োজন শুরু হয়ে যায়। আর সেদিন থেকে দশমীতে মায়ের নিরঞ্জনের আগে পর্যন্ত আমরা সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার গ্রহণ করি।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের বাড়িতে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়, তাই বলিদানের কোনও প্রথা এখানে নেই। পঞ্চমীর দিন আমাদের প্রতিমা থানে ওঠেন। তারপর সপ্তমীতে নবপত্রিকা পালকি করে আসে। সপ্তমীর দিন সাত রকমের ভাজা, পায়েস সহ মাকে সাত রকমের ভোগ অর্পণ করা হয়। অষ্টমীর দিন আট রকমের ভোগ দেওয়া হয়। সেই ভোগের মধ্যে পোলাও, ভাজা, কলাই ডালের খিচুড়ি থাকে। আর নবমীতে থাকে নয় রকমের ভোগের আয়োজন। সপ্তমী থেকে প্রতিদিন আমাদের বাড়িতে ১২ জন করে ব্রাহ্মণ ভোজন করানো হয়।"
সন্ধিপুজোর অলৌকিকতা প্রসঙ্গে রিম্পাদেবী বলেন, "সন্ধিপুজোর সময় মায়ের থানে প্রজাপতি আসবেই। এর কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তি আমরা খুঁজে পাইনি। শুধু বিশ্বাসের ওপর ভর করেই আমরা এখনও দেখে আসছি মায়ের থানে এই প্রজাপতির আগমন। আমরা মনে করি এই প্রজাপতির আগমন আমাদের জন্য শুভ বার্তা নিয়ে আসে।"
শুধু পুজোর রীতিতেই নয়, দশমীর নিরঞ্জনেও রয়েছে ঘোষাল বাড়ির বিশেষত্ব। প্রায় ২০০ জন ভক্ত মিলে মাকে কাঁধে করে নিরঞ্জনের জন্য নিয়ে যান। এই দৃশ্য দেখতে প্রতিবছর ভিড় জমান বহু মানুষ। নিরঞ্জনের পর সধবা মহিলারা জোড়া ইলিশে , সিঁদুর পরিয়ে এবং ধান দিয়ে পুজো করেন। তারপরই প্রায় কুড়ি দিনের নিরামিষ আহার ছেড়ে বাড়ির সদস্যরা আমিষ ভক্ষণ করেন।
পরিবারের সদস্য গৌতম ঘোষাল বলেন, "আগেকার দিনের মতো সেই আড়ম্বর হয়তো আর নেই, কিন্তু আমাদের ঘোষাল বাড়ির পুজো আজও জঙ্গিপুরবাসীর কাছে একটি দর্শনীয় পুজো হিসেবে খ্যাত। আমাদের মাতৃ মূর্তির কাছে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ আসেন ভক্তিভরে তাঁর আশীর্বাদ নিতে। বাড়ির সদস্যরা আমরা সবাই মিলে এই পুজোর আয়োজন করি। এমনকি আমাদের পরিবারের যে সমস্ত আত্মীয়রা বাইরে থাকেন, তাঁরাও পুজোর সময় চলে আসেন এখানে। সব মিলিয়ে জমজমাটভাবে পুজো কাটে আমাদের।"
থিমের চাকচিক্য থেকে দূরে, আজও এই সাবেকি পুজোই প্রমাণ করে, ভক্তি আর পরম্পরাই হল বাঙালির দুর্গাপুজোর আসল প্রাণ।