Loading...

জমিদারি নেই, তবু অটুট ঐতিহ্য! ৩০০ বছরের দুর্গাপুজোয় মাতবে সবংয়ের মাইতি বাড়ি

আজকাল ওয়েবডেস্ক: শরতের আকাশে সাদা মেঘ, মাঠের ধারে কাশফুল আর বাতাসে উৎসবের গন্ধ দুর্গাপুজো এলেই যেন নতুন করে জেগে ওঠে বাংলা। শহরের থিমপুজোর চাকচিক্যের পাশাপাশি গ্রামবাংলার বনেদী ও জমিদার বাড়ির পুজোগুলিও বহন করে চলেছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, বিশ্বাস আর পারিবারিক পরম্পরা। তেমনই এক ঐতিহ্যের ঠিকানা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবংয়ের মোহাড় কানুচক এলাকার মাইতি বাড়ি। পরিবারের দাবি, প্রায় ৩০০ বছর ধরে এখানে নিষ্ঠার সঙ্গে হয়ে আসছে দুর্গাপুজো।

এই পুজোর সূচনার পিছনে রয়েছে এক স্বপ্নাদেশের কাহিনি। পরিবারের প্রবীণ সদস্য প্রভাত মাইতির কথায়, তাঁদের কুলদেবতা দধিবামন জীউ। পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ বছর আগে রামপ্রসাদের পূর্বপুরুষ জগমোহন দধিবামন জীউকে এনে পুজো শুরু করেন। সেই ধর্মীয় পরম্পরার ধারাবাহিকতায় পরে পরিবারে যুক্ত হয় দুর্গাপুজো।

ADVERTISEMENT

পরিবারের সদস্যদের মুখে শোনা যায়, ওড়িশার জাজপুর এলাকা থেকে সবংয়ের মোহাড় কানুচকে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন রামপ্রসাদ মহান্তি। সেই সময় তিনি জমিদারি দেখাশোনার পাশাপাশি লবণ সংক্রান্ত রাজস্ব সংগ্রহের কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে পরিবারের দাবি। পরবর্তীকালে পরিবারের পদবি পরিবর্তিত হয়ে ‘মাইতি’ হয়।

আরও পড়ুন

সম্পদ, প্রতিপত্তি এবং সামাজিক মর্যাদা কোনও কিছুর অভাব ছিল না রামপ্রসাদের। কিন্তু নিঃসন্তান হওয়ায় তাঁর মনে ছিল গভীর আক্ষেপ। পরিবারের প্রচলিত কাহিনি বলছে, এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেবী দুর্গার দর্শন পান। স্বপ্নাদেশে নাকি দেবী নির্দেশ দেন নিজের হাতে মাটির প্রতিমা গড়ে দুর্গার আরাধনা করলে তাঁর মনস্কামনা পূর্ণ হবে।

সেই বিশ্বাস নিয়েই রামপ্রসাদ নিজ হাতে মাটি দিয়ে দুর্গামূর্তি তৈরি করে পুজো শুরু করেন। আর সেই থেকেই পথচলা মাইতি বাড়ির দুর্গোৎসবের। সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু, বদলেছে প্রজন্ম, তবে থামেনি দেবীর আরাধনা।

বর্তমানে স্থানীয় শিল্পীর হাতে তৈরি হয় একচালার সাবেকি দুর্গাপ্রতিমা। দেবীর দু’পাশে থাকেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী। তাঁদের নীচে স্থান পান কার্তিক ও গণেশ। আধুনিকতার ছোঁয়া এলেও প্রতিমার গঠন ও পুজোর রীতিতে এখনও সাবেকিয়ানার ছাপ স্পষ্ট।

মাইতি বাড়ির দুর্গাপুজোর আরেক বিশেষত্ব হল, এখানে মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজোর আচার। পঞ্চমী থেকে নবমী পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা নিয়ম মেনে নিরামিষ আহার করেন। একসময় এই পুজোয় পাঁঠাবলির প্রথাও ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই রীতি বন্ধ হয়েছে। তবে সেই সময়ের বলির খড়্গ আজও পরিবারের কাছে সযত্নে সংরক্ষিত।

শুধু খড়্গই নয়, বহু পুরনো থালা-বাসন, ভোগ রান্নার হাঁড়ি এবং পুজোয় ব্যবহৃত নানা সামগ্রী এখনও আগলে রেখেছেন পরিবারের সদস্যরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত এইসব জিনিস যেন আজও বহন করে চলেছে পুরনো দিনের স্মৃতি।

দুর্গাপুজোর প্রায় এক মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। বাড়ির গৃহবধূরা পুজোয় ব্যবহৃত পুরনো সামগ্রী ধোয়া-মোছা ও পরিষ্কার করার কাজে হাত লাগান। কর্মসূত্রে দূরে থাকা পরিবারের মেয়েরাও চেষ্টা করেন কয়েকদিন আগে বাপের বাড়িতে ফিরে আসতে। মা-কাকিমাদের সঙ্গে তাঁরা ভাগ করে নেন পুজোর নানা দায়িত্ব। এই বাড়ির ভোগেও রয়েছে আলাদা ঐতিহ্য। দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় কাঁঠালি কলা, নারকেল দিয়ে তৈরি নানা মিষ্টি এবং গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি। বহু বছর ধরে একই নিয়মে চলে আসছে এই বিশেষ ভোগের আয়োজন।

দশমীর দিন বাড়ির নিজস্ব পুকুরেই বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা। তখন একদিকে দেবী বিদায়ের বিষাদ, অন্যদিকে পরিবারের সকল সদস্যের একসঙ্গে থাকার আনন্দ দুই আবেগ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। পুজোর কয়েকটা দিন নাচ, গান, আড্ডা আর হইহুল্লোড়ে জমে ওঠে গোটা বাড়ি।

জমিদারি এখন অতীত। বদলে গিয়েছে সমাজ, বদলেছে জীবনযাত্রাও। তবুও প্রায় তিনশো বছরের পুরনো পুজোর রীতি, পারিবারিক বন্ধন আর বিশ্বাসকে আজও আগলে রেখেছে মাইতি পরিবার। স্বপ্নাদেশে শুরু হওয়া সেই পুজো আজও সবংয়ের গ্রামবাংলায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী।

ADVERTISEMENT