আজকাল ওয়েবডেস্ক: দুর্গা মানেই দশভুজা, সঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ। বাঙালির এই চেনা ছবিটাই বদলে যায় মুর্শিদাবাদের কান্দির জজান গ্রামে। এখানে দুর্গা দশভুজা নন, তিনি চতুর্ভুজা। সঙ্গে ছেলেমেয়েরা নেই, আছে শুধু সিংহ আর অসুর। তাই এই পুজো এলাকায় খ্যাত ‘তিন পুতুলের দুর্গা’ নামে।
দুর্গা, সিংহ আর অসুর—এই তিন পুতুলেই পুজো! জজানের ৫০০ বছরের রহস্যময় ঐতিহ্য
ADVERTISEMENT
আনুমানিক ৫০০ বছরের পুরনো এই পুজো আজও একই রকম রহস্য আর নিয়মে ঘেরা। আর পাঁচটা বনেদি বাড়ির পুজোর মতো এখানে আড়ম্বর নেই, আছে সাধ্যমত আয়োজন আর কঠোর প্রাচীন রীতিনীতি, যা আজও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন সিংহ বাড়ির সদস্যরা।
আরও পড়ুন
এই পুজোর মূল আকর্ষণই হল প্রতিমা। একচালার মাটির সাজের প্রতিমায় মা দুর্গা এখানে চার হাতে পূজিতা হন। দুই পাশে নেই কোনও পুত্র-কন্যা। মায়ের সঙ্গে থাকেন শুধু বাহন সিংহ আর পদতলে অসুর। দুর্গা, সিংহ আর অসুর – এই তিন পুতুল নিয়েই পুজো,।
পরিবারের সদস্য মনোরঞ্জন সিংহ বলেন, "আমাদের প্রতিমা চার হাতের। মায়ের সঙ্গে থাকেন সিংহ এবং অসুর। আমরা পূর্বপুরুষদের নিয়ম মেনেই আজও পুজো করে আসছি।"
এই পুজোর আরেকটি অদ্ভুত রীতি হল, মায়ের পুজোতে কোনও অন্নভোগ দেওয়া হয় না। তার পরিবর্তে নৈবেদ্য ও ফলমূল সাজিয়ে দেওয়া হয়।
আর সবচেয়ে অবাক করা নিয়ম হল, পরিবারের কোনও সদস্যই পুজোর আচার-বিচারে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। এমনকি ঠাকুরদালানের চৌকাঠ পর্যন্ত টপকানোর অধিকার নেই তাঁদের। পুরোহিত এবং তাঁর সহকারীরাই পুজোর সমস্ত কাজ করেন। বাড়ির লোকজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুষ্পাঞ্জলি দেন। তবে কেন এই নিয়ম? এর সঠিক কারণ বাড়ির সদস্যরাও জানেন না। তাঁদের মতে, এটাই পূর্বপুরুষদের তৈরি নিয়ম, যা আজও মেনে চলা হয়।
শাক্ত মতে পুজো হয় বলে এখানে বলি প্রথা আজও বর্তমান। ষষ্ঠীতে ঘট আসে, সপ্তমীতে বলি হয়। অষ্টমীতেও চলে বলি।
তবে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী রীতি দেখা যায় নবমীতে। সেদিন মোষ এবং মেষের বিয়ে দিয়ে তারপর মোষ বলি দেওয়া হয়। এই অদ্ভুত রীতি দেখতে বহু মানুষ ভিড় জমান এখানে।
বিসর্জনের পালাটিও এখানে রাজকীয়। দশমীতে জজান গ্রামের মোট ১৮টি ঠাকুরকে একসঙ্গে নিকটবর্তী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের চারপাশে ঘোরানো হয়, তারপরে বিসর্জনের ব্যবস্থা করা হয়। আর এই ১৮টি ঠাকুরই গ্রামবাসীরা কাঁধে করে নিয়ে যান। এই দৃশ্য সত্যিই মনমুগ্ধকর। যা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন এখানে। শুধু তাই নয়, বীরভূম থেকেও ঢাকিরা আসেন জজান সিংহ বাড়ির পুজোতে ঢাক বাজাতে।
বাড়ির পুজো হলেও এটি এখন আর শুধু সিংহ বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই পুজোকে উপলক্ষ করে বাড়ির যে সমস্ত সদস্যরা বাইরে থাকেন, তারাও এই সময় বাড়িতে চলে আসেন। সকলে মিলে একসঙ্গে এই পুজো উপভোগ করেন। শুধু বাড়ির সদস্যরাই নয়, আশেপাশের এলাকাবাসীও মেতে ওঠেন এই পুজোতে।
এক কোথায় বলতে গেলে, থিমের চমকের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে জজানের চার হাতের মা দূর্গা আজও মুর্শিদাবাদের অন্যতম প্রাচীন বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যবাহী পুজো হিসেবে খ্যাত।
ADVERTISEMENT
ADVERTISEMENT
সবাই যা পড়ছেন
ADVERTISEMENT