আজকাল ওয়েবডেস্ক: অপেক্ষার আর মাত্র কয়েকটা দিন। আকাশে শরতের মেঘ, বাতাসে শিউলির মিষ্টি সুগন্ধ ভাসতে শুরু করেছে। কাশফুলের দোলায় প্রকৃতি বার্তা দিচ্ছে, উমা আসছেন বাপের বাড়িতে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে সর্বত্র সাজো সাজো রব৷ দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজারের ঢাকিপাড়ায় ব্যস্ততাও এখন তুঙ্গে। ঘরে ঘরে চলছে ঢাক মেরামত, নতুন চামড়া লাগানো থেকে শুরু করে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কারণ, আর কয়েকদিন পরেই কাঁধে ঢাক নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে ঢাকিদের। আধুনিকতার দাপটে পুজোর মণ্ডপে আলোকসজ্জা আর অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের রমরমা বাড়লেও ঢাকের সেই চিরাচরিত বোলের আকর্ষণ আজও অমলিন। দেবীর বোধন থেকে সন্ধিপুজো, আরতি থেকে বিসর্জন—দুর্গোৎসবের প্রতিটি পর্বে ঢাকের আওয়াজ যেন উৎসবের প্রাণ। ঢাকের কাঠির ছন্দ ছাড়া বাঙালির পুজোর আনন্দ যেন এখনও কোথাও অসম্পূর্ণ। আর সেই চিরন্তন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতেই নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন মন্দিরবাজারের ঢাকিরা।
ঢাকিপাড়ার প্রতিটি বাড়িতেই এখন ব্যস্ততার ছবি। কোথাও পুরোনো ঢাকের খোল পরীক্ষা করা হচ্ছে, কোথাও ফেটে যাওয়া চামড়া বদলে নতুন চামড়া লাগানো হচ্ছে। আবার কোথাও ঢাকের দল টানটান করে আওয়াজ ঠিক করার কাজ চলছে। শুধু বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত করাই নয়, চলছে বোলের মহড়াও। পুজোর মণ্ডপে যাতে ঢাকের আওয়াজে কোনও খামতি না থাকে, সেই চেষ্টায় দিনরাত এক করে কাজ করছেন শিল্পীরা।
তবে এই প্রস্তুতির পিছনে রয়েছে এক কঠিন জীবনসংগ্রামের গল্প। বছরের অধিকাংশ সময় দিনমজুরের কাজ করেই সংসার চালাতে হয় বহু ঢাকিকে। দুর্গাপুজোর এই পাঁচটা দিনই তাঁদের কাছে বাড়তি রোজগারের বড় সুযোগ। পুজোর সময় কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন পুজো কমিটি এবং বনেদি বাড়ি থেকে আসে ডাক। ইতিমধ্যেই অনেক ঢাকির সঙ্গে আগাম বায়না সেরে ফেলেছেন পুজো উদ্যোক্তারা। কেউ আবার শিয়ালদহ সহ বিভিন্ন বড় স্টেশনের ঢাকির বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ঢাকি ভোলানাথ দাসের কথায়, “আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। পুজোর পাঁচটা দিন পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে রুজি-রুটির টানে শহরতলিতে গিয়ে থাকতে হবে। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্ট থাকলেও সংসারের কথা ভেবেই এই পেশায় নামতে হয়। পুজো শেষ করে বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে আবার আনন্দে মেতে ওঠার অপেক্ষায় থাকি৷”
একই ছবি রবিন দাসের পরিবারেও। তাঁর বক্তব্য, “বছরের বাকি সময় দিনমজুরি করেই সংসার চলে। দুর্গাপুজোর পাঁচ দিন ঢাক বাজানোর জন্য ডাক আসে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতেই ঢাক কাঁধে বেরিয়ে পড়ি।”
এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। খাওয়া-দাওয়ার কথা ভুলে ঢাক তৈরি থেকে শুরু করে সমস্ত কাজ খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছেন এই বাদ্যশিল্পীরা। কারণ, পুজোর সময় কোনও ত্রুটি রাখার সুযোগ নেই। অন্যদিকে, ঢাকিদের এই পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের কথা মাথায় রেখেই তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছেন পুজো উদ্যোক্তারাও। ডায়মন্ডহারবারের ব্যাংক পাড়া সর্বজনীন পুজো কমিটির সদস্য পার্থিব দাস জানান, “ঢাক ছাড়া দুর্গাপুজোর কথা ভাবাই যায় না। পুজোর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে ঢাকের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পাঁচ দিন ধরে ঢাকিরা নিজেদের পরিবার ছেড়ে পুজোমণ্ডপে থাকেন। তাই তাঁদের বাইরের মানুষ হিসেবে নয়, নিজেদের পরিবারের সদস্য হিসেবেই মনে করি। ঢাকিদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের কথাও ভাবা হয়। তাঁদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতাও করা হয়। এ’বছরও সেই ধারা বজায় থাকবে।”
উৎসবের আলোয় যখন ঝলমল করবে শহর থেকে গ্রাম, ঢাকের তালে যখন মেতে উঠবে আট থেকে আশি, তখন সেই আনন্দের নেপথ্যে থাকবেন এই শিল্পীরাই। তাঁদের হাতের কাঠিতে বেজে উঠবে আগমনী সুর, তাঁদের ছন্দেই প্রাণ পাবে পুজোর প্রতিটি মুহূর্ত। পুজোর পাঁচ দিনের আনন্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম হয়তো উৎসবের ভিড়ে অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু তাঁদের ঢাকের আওয়াজ ছাড়া বাঙালির শারদোৎসব যে কতটা অসম্পূর্ণ, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
সংসারের দায়িত্ব এক কাঁধে, আর অন্য কাঁধে ঢাক। এই দুইয়ের ভার সামলেই উমার আগমনী সুর ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত মন্দিরবাজারের ঢাকিরা।