Loading...

ইতিহাসের গন্ধে দুর্গোৎসব! ৩৫০ বছরের পুরনো পুজোয় আজও মেতে ওঠে পিংলার সিংহ বাড়ি

ইন্দ্রজিৎ সাহু: জমিদারি নেই, আগের মতো জাঁকজমকও নেই। তবু পুজোর আন্তরিকতায় কোনও খামতি নেই। পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া রীতি, আচার আর বিশ্বাসকে আঁকড়ে আজও দুর্গাপুজো করে চলেছে পিংলার ভাসানপুকুরের সিংহ পরিবার। প্রায় ৩৫০ বছরের প্রাচীন এই পুজো ঘিরে এখনও শরৎ এলেই আলাদা আবেগ তৈরি হয় এলাকায়।

ভাসানপুকুর থেকে প্রায় ১৫০ মিটার এগোলেই বড়পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সিংহবাড়ি। পরিবারের সদস্যদের মুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৩৫০ বছর আগে রাজা লাউ সেনের রাজত্বকালে তাঁর সেনাপতি শিবরাম সিংহ এই এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন। সেই সময়ই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চণ্ডীমন্দির। পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে নিজের হাতে দুর্গাপ্রতিমা গড়ে শুরু করেন দেবীর আরাধনা। সেই থেকেই সিংহবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা।

ADVERTISEMENT

সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। প্রাচীন চণ্ডীমন্দির আজ জীর্ণ। জমিদারির ঐশ্বর্যও আর নেই। কিন্তু পুজোর নিয়মে কোনও ছেদ পড়েনি। দুর্গাপুজোর প্রায় ১৫ দিন আগে থেকেই বাড়ির একটি মাটির ঘরে কুলদেবী মা চণ্ডীর আরাধনা শুরু হয়। পাশের ঘরেই তৈরি হতে থাকে চতুর্ভুজা দুর্গাপ্রতিমা।

আরও পড়ুন

PUJO

এই বাড়ির প্রতিমার রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। দেবীর মুখ কোনও ছাঁচে তৈরি করা হয় না, শিল্পীর হাতে গড়ে ওঠে মুখাবয়ব। মাটির প্রলেপ দেওয়ার পর থেকেই মুখ ছাড়া দেবীর প্রায় গোটা শরীর ঢেকে রাখা হয়। প্রতিমার বিন্যাসেও রয়েছে আলাদা রীতি। এখানে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর অবস্থান গণেশ ও কার্তিকের নীচে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই নিয়ম মেনে প্রতিমা তৈরি হয়ে আসছে।

একসময় সিংহবাড়ির পুজোয় বলির প্রচলন ছিল। এখন সেই প্রথা বন্ধ। তবে অতীতের স্মৃতি এখনও যত্নে ধরে রেখেছে পরিবার। আজও সংরক্ষিত রয়েছে সেই সময়ের প্রাচীন খড়্গ এবং পুজোয় ব্যবহৃত পুরনো থালা-বাসন। পরিবারের সদস্যদের কাছে সেগুলি শুধুই পুজোর সামগ্রী নয়, বরং কয়েক শতকের ইতিহাসের সাক্ষী।

সন্ধিপুজোতেও রয়েছে বিশেষ রীতি। সেই সময় দেবী দুর্গাকে নিবেদন করা হয় জবা ফুল। সপ্তমীর দিন কুলদেবী মা চণ্ডীর হোমকুণ্ডে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরিবারের প্রথা অনুযায়ী, সেই আগুন সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালিয়ে রাখা হয়।

পুজোর বাহ্যিক আড়ম্বর হয়তো আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। কিন্তু পূর্বপুরুষের নিয়ম পালনে আজও সমান যত্নবান সিংহ পরিবারের উত্তরসূরিরা। তাঁদের কাছে এই পুজো শুধুই দুর্গোৎসব নয়, বরং বংশপরম্পরায় বয়ে চলা স্মৃতি, বিশ্বাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল।

তাই জীর্ণ মন্দির, পুরনো খড়্গ আর হোমকুণ্ডের অগ্নিশিখার মধ্যেই আজও বেঁচে রয়েছে পিংলার সিংহবাড়ির কয়েক শতকের ইতিহাস। সময় পাল্টেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু দেবীর আরাধনার সেই পুরনো সুর এখনও অমলিন।

ADVERTISEMENT