আজকাল ওয়েবডেস্ক: চারপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু ঘন সবুজ জঙ্গল। মাথার উপর আকাশটাও যেন গাছের পাতার আড়ালে ঢাকা। কখনও দূর থেকে ভেসে আসে হাতির ডাক, কখনও জঙ্গলের নিস্তব্ধতা ভেঙে ছুটে যায় বাইসনের দল। কোথাও আবার চিতা বাঘের আতঙ্ক। সন্ধ্যা নামলেই যে পথে মানুষের যাতায়াত থেমে যায়, সেই গভীর অরণ্যের বুকেই বছরের কয়েকটা দিন যেন অন্য এক আবহ তৈরি হয়। মাদলের তালে, আদিবাসী রীতিতে, বন বস্তির মানুষের আনন্দে সেখানে আবির্ভূত হন মা দুর্গা। আর তাই এই পুজো শুধু দুর্গাপুজো নয়, তোতাপাড়ার মানুষের কাছে তিনি 'বনদুর্গা'।
জলপাইগুড়ি বনবিভাগের মোরাঘাট রেঞ্জের অন্তর্গত তোতাপাড়া বিটের পাশেই ছোট্ট বনবস্তি তোতাপাড়া। বানারহাট ব্লকের জঙ্গল ঘেরা এই জনপদে পৌঁছনোটাও যেন এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। গয়েরকাটা থেকে নাথুয়াগামী রাজ্য সড়ক ধরে খট্টিমারি বিট অফিসের সামনে দিয়ে সবুজ অরণ্য চিরে এগিয়ে যেতে হয় আরও প্রায় আট কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা। তারপরই দেখা মেলে তোতাপাড়া বনবস্তির।
কিন্তু এই পথ দিনের বেলায় যতটা সুন্দর, সন্ধ্যার পর ততটাই ভয়ঙ্কর। কারণ এই জঙ্গলই হাতি, বাইসন ও লেপার্ডের বিচরণক্ষেত্র। তাই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই বনবস্তির মানুষজনকে ফিরতে হয় নিজেদের ঘরে। জঙ্গলের অন্দরে বসবাসকারী এই মানুষগুলির কাছে রাত নামা মানেই বাড়তি সতর্কতা।
আর সেই কারণেই একসময় প্রশ্ন উঠেছিল পুজোর দিনগুলিতে এই বনবস্তির কচিকাঁচারা আনন্দ করবে কীভাবে? তারাও কি মণ্ডপে গিয়ে ঢাকের শব্দ শুনবে না? তারাও কি নতুন জামা পরে মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে না? এই ভাবনা থেকেই প্রায় ১৬ বছর আগে তৎকালীন জলপাইগুড়ির বন আধিকারিক কল্যাণ দাসের উদ্যোগে তোতাপাড়া বনবস্তিতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। তারপর থেকে বছরের পর বছর ধরে জঙ্গলের বুকেই চলে আসছে এই অনন্য পুজো।
এখানে মা দুর্গা ‘বনদুর্গা’
জঙ্গলের মাঝে, বন্যপ্রাণীর আতঙ্ককে সঙ্গী করেই যেখানে মানুষের জীবনযাপন, সেখানে দুর্গাপুজোর এই আয়োজনও যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক গভীর সম্পর্কের প্রতীক। এখানকার দেবী তাই আর পাঁচটা পুজোর মতো নন। তিনি বনদুর্গা।
এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য দেবীর সাজ। এখানে দুর্গাকে সাজানো হয় এক আদিবাসী বধূর রূপে। আদিবাসী রমণীর সাজে সেজে ওঠেন মা দুর্গা। মাদলের তালে, নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে বনবস্তির মানুষজন বরণ করে নেন দেবীকে।
ঢাকের চেনা শব্দের পাশাপাশি মাদলের তালে যখন মুখর হয়ে ওঠে জঙ্গলের পরিবেশ, তখন মনে হয় যেন অরণ্যের বুকেই প্রকৃতি আর সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে।
এখানেপুজো নিতে আসে হাতির দল! স্বয়ং গজরাজ হাজির হবে এটাই যেন বর্তমানে এক নিয়ম-নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। তোতাপাড়ার এই দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে জঙ্গলের আশপাশে হাতির আনাগোনা নতুন কিছু নয়। কখনও দূরে দাঁড়িয়ে হাতির দলকে দেখা যায়, কখনও আবার জঙ্গলের পথেই তাদের উপস্থিতির চিহ্ন মেলে। তাই এখানে পুজো মানেই একদিকে উৎসবের আনন্দ, অন্যদিকে বাড়তি সতর্কতা। সূর্য ডোবার আগেই পুজো সেরে দল বেঁধে বাড়ি ফেরেন আদিবাসী মানুষজন। মায়ের কাছে প্রার্থনা সেরে সন্ধ্যার আগেই নিরাপদে নিজেদের ঘরে ফিরে যাওয়াটাই তাঁদের কাছে বড় বিষয়।
বনদপ্তরই এখানে পুজোর অন্যতম ভরসা
তোতাপাড়ার এই দুর্গাপুজোর সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িয়ে রয়েছে বনদপ্তর। প্রতি বছর জলপাইগুড়ি বনবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা এই পুজোয় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। শুধু পুজোর উদ্বোধন নয়, বনবস্তির মানুষদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া থেকে শুরু করে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।মোরাঘাট রেঞ্জের রেঞ্জার চন্দন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বিগত বছরগুলির মতো এবারও বনদপ্তর তোতাপাড়ার গ্রামবাসীদের সঙ্গে পুজোর আনন্দে শামিল হবে। গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। পুজোর দিনগুলিতে বাড়তি নজরদারিও রাখা হবে বনদপ্তরের তরফে।
বনদপ্তর আশাবাদী, এ বছরও জলপাইগুড়ির মুখ্য বনপাল স্বশরীরে উপস্থিত থেকে এই ব্যতিক্রমী দুর্গাপুজোর শুভ উদ্বোধন করবেন।
আলোর উৎসবের মাঝেও এখানে সূর্যাস্তই শেষ সীমা
শহরের পুজোয় রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়ে। আলো ঝলমলে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। কিন্তু তোতাপাড়ার গল্পটা সম্পূর্ণ আলাদা।
এখানে সূর্য ডোবার আগেই পুজো শেষ করে বাড়ি ফিরতে হয়। কারণ মায়ের আশীর্বাদ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে জঙ্গলের নিয়ম। বন্যপ্রাণীদের বিচরণক্ষেত্রে বসবাসকারী মানুষজন সেই নিয়মকে সম্মান করেন।
তবুও উৎসবের আনন্দে কোনও খামতি থাকে না। নতুন জামা, মাদলের তালে নাচ, দেবীকে বরণ, প্রার্থনা আর নিজেদের ঐতিহ্য সব মিলিয়ে তোতাপাড়ার দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে একেবারেই আলাদা।
শহরের কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বহু দূরে, সত্যিকারের অরণ্যের বুকেই এখানে মা দুর্গার আরাধনা। চারদিকে গভীর জঙ্গল, মাথার উপর সবুজের ছাউনি, পাশে বন্যপ্রাণীর বিচরণ তারই মাঝে আদিবাসী বধূর সাজে আসেন দেবী। এ যেন শুধু পুজো নয় অরণ্যের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের গল্প।
ভয়ের মাঝেও উৎসবকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প।
আর জঙ্গলের বুক থেকে মাদলের তালে মায়ের আগমনী শোনার গল্প। তাই তোতাপাড়ায় দুর্গাপুজো এলেই বনবস্তির মানুষজনের মুখে একটাই আনন্দ “জঙ্গলের মা আসছেন, আমাদের বনদুর্গা আসছেন।”